হজরত আলী (রা.)-এর শাসন আমলে বুড়ো একটি লোক রাস্তার ধারে বসে ভিক্ষা করছিল। আশপাশের লোকজনের কাছে তিনি জানতে চাইলে সবাই জবাব দিলো যে, এই লোকটি একজন খ্রিষ্টান। চোখে দেখেন না বলে কাজ করতে পারেন না। তাই তিনি ভিক্ষা করছেন। তবে জোয়ানকালে তিনি সবাইকে সেবা দিয়েছেন। একথা শুনে হজরত আলী (রা.) বিস্ময় প্রকাশ করে জনগণের উদ্দেশে বললেন, “এই লোকটার যখন শক্তি-সামর্থ্য ছিল তখন আপনারা তার সেবা নিয়েছেন। আর বিপদের সময় তিনি সাহায্য পাবেন না- এটা তো হতে পারে না। তিনি কোন ধর্মের অনুসারী সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।”
'প্রত্যুপকার' গল্পের হস্তপদবদ্ধ ব্যক্তির নিবাস ছিল ডেমাস্কাস।
স্বার্থপরের মতো নিজের প্রাণরক্ষার্থে আরেকজনের প্রাণের বিনাশের কারণ হতে চাননি বলে আলী ইবনে আব্বাস ছেড়ে দিলেও বন্দি লোকটি পালিয়ে যাননি।
'প্রত্যুপকার' গল্পে ডেমাস্কাসে আলী ইবনে আব্বাসের আশ্রয়দাতা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিটি ঘটনাক্রমে খলিফা মামুনের সেনাদল কর্তৃক বন্দি হন। খলিফার আদেশে আলী' ইবনে আব্বাস ওই বন্দি লোকটাকে গৃহে অন্তরিন করে রাখলেন। কথা প্রসঙ্গে আলী ইবনে আব্বাস ওই বন্দি ব্যক্তির পরিচয় পেলেন। তিনি জানতে পারলেন ওই বন্দি ব্যক্তির আশ্রয়েই মাসখানেক নিরাপদে থেকে অতি সম্মান ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্বদেশে ফিরেছিলেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পেয়ে তিনি তাঁকে মুক্ত করে দিতে চাইলেন। তখন ওই বন্দি রাজি হলেন না। তিনি বললেন, "আমি এত নীচাশয় ও স্বার্থপর নহি যে, কিছুকাল পূর্বে যে প্রাণের রক্ষা করিয়াছি, আপন প্রাণ রক্ষার্থে এক্ষণে সেই প্রাণের বিনাশের কারণ হইব।"
উদ্দীপকের বর্ণনা 'প্রত্যুপকার' গল্পের আলী ইবনে আব্বাসের কৃতজ্ঞতা, মানবতা ও ঋণ স্বীকারের নীতিকে নির্দেশ করে।
'প্রত্যুপকার' গল্পে দেখা যায়, আলী ইবনে আব্বাস এক অচেনা লোকের প্রাণরক্ষা করেন; পরে একই ব্যক্তি বিপদে পড়ে তাঁর সামনে হাজির হলে তিনি কৃতজ্ঞতা ও মানবতার দায়ে তার পক্ষে দাঁড়ান। গল্পটি দেখায়- মানবীয় সেবা কখনো ব্যর্থ হয়ে যায় না, সময়মতো তার প্রতিদান ফিরে আসে।
উদ্দীপকে হজরত আলী (রা.) দেখিয়েছেন যে, মানুষ যে ধর্মের অনুসারীর হোক না কেন, তার পূর্বেকার সেবা ভুলে যাওয়া যায় না; বিপদের সময় তাকে সহায়তা করাই মানবধর্ম। 'প্রত্যুপকার' গল্পেও দেখা যায়, আলী ইবনে আব্বাস নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতিদান দিয়েছেন। উদ্দীপক ও 'প্রত্যুপকার' গল্প উভয় ক্ষেত্রেই উপকারের বিপরীতে প্রত্যুপকার, মানবিক দায়িত্ব ও নৈতিকতার উচ্চতর শিক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকটি সরাসরি 'প্রত্যুপকার' গল্পের নৈতিক বার্তাকে নির্দেশ করে।
হ্যাঁ, উপকারের প্রতিদান, মানবিক দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বোধের দিক থেকে উদ্দীপকে 'প্রত্যুপকার' গল্পের মূলভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
'প্রত্যুপকার' গল্পে উপকারী ব্যক্তিকে রক্ষা করার জন্য আলী ইবনে আব্বাস নিজের জীবন বিপন্ন করেও সত্য ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ান। তাঁর কৃতজ্ঞতা, সাহস ও দয়া গল্পটিকে মানবতার সুন্দর উদাহরণে রূপ দেয়।
উদ্দীপকে যেমন হজরত আলী (রা.) ধর্ম-জাতি না দেখে একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুকের দায়িত্ব নেন, তেমনই গল্পে আলী ইবনে আব্বাস ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েও উপকারদাতাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেন। উভয় ক্ষেত্রেই মানবিকতা বড়ো হয়ে উঠেছে। উভয় ক্ষেত্রেই ধর্ম-সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত লাভ নয়- বরং মানবতার ঋণ, ন্যায়পরায়ণতা ও কৃতজ্ঞতা হয়ে উঠেছে মূলভিত্তি।
উদ্দীপকে হজরত আলী (রা.) দেখিয়েছেন- মানুষকে সাহায্য করা কেবল ধর্মীয় নয়, মানবিক দায়িত্ব। কর্মক্ষম অবস্থায় সমাজ তার সেবা নিয়ে অক্ষম অবস্থায় তাকে সাহায্য না করা অন্যায়। ঠিক এ মূল্যবোধই 'প্রত্যুপকার' গল্পে প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পে আলী ইবনে আব্বাস অতীতে পাওয়া উপকারের মর্যাদা রাখেন এবং নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও উপকারী ব্যক্তির প্রাণরক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। উভয় ক্ষেত্রেই উপকারের প্রতিদান, দয়া, ন্যায় এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দেওয়ার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে প্রত্যুপকার গল্পের সম্পূর্ণ মূলভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
