উদ্দীপক-১
পাড়ার বালকদের সর্দার সুজন। সারাদিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো, এর ওর গাছের ফল ছেঁড়া, নদীতে দাপাদাপি করা তার কাজ। শত দুরন্তপনার মাঝেও ছোট ভাই সুমনকে আগলে রাখে সে। তাকে রেখে কোনো খাবারও মুখে তোলে না।
উদ্দীপক-২
সারাক্ষণ সংসারে নাই-নাই, নাই-নাই আর ভালো লাগে না শেফালীর। ঘর থেকে বের হলে পাওনাদারদের তাগাদা তাকে অতিষ্ঠ করে। ছেলেরা কবে নতুন জামা পরেছে মনে পড়ে না তার।
আজকাল চাষাদের ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা পড়েছে।
"ঠাকুরের হাঁড়ি দেখচি শিকেয় উঠেচে"- কথাটি দ্বারা হরিহরের দারিদ্র্যপীড়িত সাংসারের দুরবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।
হরিহর দরিদ্র ব্রাহ্মণ। স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে কায়-ক্লেশে তার সংসার চলে। গোমস্তার কাজ, যজমানি ইত্যাদি করে বহু কষ্টে দিন কেটে যায়। একদিন সে দশঘরা গ্রামে যায় তাগাদার জন্য। সেই গ্রামের এক লোক হরিহরকে ঐ গ্রামে বসবাস করার প্রস্তাব করে এবং তার কাছ থেকে মন্ত্র নিতে চায়। কিন্তু হরিহর তৎক্ষণাৎ রাজি হয় না। কারণ দরিদ্র হলেও তার আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। তৎক্ষণাৎ রাজি হলে লোকটি ভাবত সে বুঝি চরম অর্থ-কষ্টে পড়েছে। এই ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছে প্রশ্নোক্ত কথাটিতে।
উদ্দীপক ২-এ 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের হরিহরের সংসারের দারিদ্র্যের দিকটি ফুটে উঠেছে। দারিদ্র্য একটি অভিশাপ স্বরূপ।
দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে মানুষ দিশেহারা। খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, শিক্ষা নেই। চারিদিক শুধু হাহাকার। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় এই সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
উদ্দীপক ২-এ এক দরিদ্র পরিবারের চিত্র ফুটে উঠেছে। সংসারে সারাক্ষণ নাই নাই শুনতে আর ভালো লাগে না শেফালীর। ঘর থেকে বের হলে পাওনাদারের তাগাদায় সে অতিষ্ঠ। ছেলেদের ঠিকমতো পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করতে পারে না। 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে স্বামী আর দুই সন্তান নিয়ে সর্বজয়ার ছোট সংসার। তার সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। স্বামীর সামান্য উপার্জনে ঠিকমতো চলা তো দূরে থাক, দুবেলা অন্নসংস্থানই কষ্টকর। ধার-দেনা করে কোনো রকমে চলতে হয় তাদের। সর্বজয়ার সংসারের এই দৈন্য-দশার দিকটিই উদ্দীপকে ফুটে উঠেছে।
প্রশ্নোক্ত মন্তব্যের সঙ্গে আমি একমত। কারণ হরিহর-সর্বজয়ার সংসারের অভাব-অনটনের দিককে ছাপিয়েও উদ্দীপক ১-এর বক্তব্য অর্থাৎ শৈশবের চিরায়ত দুরন্তপনা ও ভাই-বোনের আত্মিক সম্পর্কের দিকটি 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে।
মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হলো শৈশবকাল। সারাদিন কাটে খেলাধুলা, দৌড়-ঝাঁপ, ঘোরাঘুরিতে। এ সময় বাবা-মায়ের শাসন- বারণ উপেক্ষা করে শিশুরা দুরন্তপনায় মেতে ওঠে। আর এতেই লুকিয়ে থাকে নিঃসীম আনন্দ।
উদ্দীপক ১-এ দুরন্ত শৈশবের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সুজন পাড়ার বালকদের সর্দার সেজে সারাদিন দলবল নিয়ে দুরন্তপনায় মেতে থাকে। এই দুরন্তপনার মাঝেও তার ছোট ভাই সুমনকে আগলে রাখে। শৈশবের এই চিরায়ত দুরন্তপনা এবং ভাই-বোনের আত্মিক সম্পর্কের দিকটি 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে হরিহর-সর্বজয়ার সংসারের আর্থিক অনটনের দিকটি নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বর্ণনায় গ্রামবাংলার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দারিদ্র্যের সেই কঠিন বাস্তবতা ছাপিয়ে দুই ভাই-বোনের শৈশবের দুরন্তপনা এবং দারিদ্র্যপীড়িত সমাজের বাস্তব জীবনচিত্র তাদের আত্মিক সম্পর্কের দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। অপু ও দুর্গার মাধ্যমে গল্পকার বাঙালি শিশুর দুরন্ত শৈশবের চিরন্তন রূপ অঙ্কন করেছেন।
