আদিত্য এবং আদিবা দুই ভাই-বোন। গ্রামেই তাদের বেড়ে ওঠা। কিন্তু ওরা সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে মেতে থাকে অথবা ঘরে বসেই টিভিতে কোনো প্রোগ্রাম দেখে। ঘর থেকে বেরোতেই চায় না। তাদের মা আনোয়ারা বেগম এ নিয়ে তাদেরকে কখনো খুব বকাবকি করেন আবার কখনো তাদের আদর করে বুঝিয়ে বলেন। তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ দেখতে চান।
'আম-আঁটির ভেঁপু' শীর্ষক গল্পের রচয়িতা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
হরিহর রায়ের বাড়ির অবস্থা অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ।
হরিহর দুর্গা ও অপুর বাবা। সে গ্রামের অন্নদা রায়ের বাড়িতে গোমস্তার কাজ করে। মাসিক বেতন আট টাকা, তাও নিয়মিত পায় না। ফলে হরিহরের বাড়িটি দীর্ঘদিন মেরামত করা সম্ভব হয়নি। বাড়িটির সামনের দিকের রোয়াক ভাঙা, দেয়ালের ফাটলে আগাছা বাসা বেঁধেছে। দরজা-জানালার কপাট একদমই ভেঙে গেছে। সেগুলো নারিকেলের দাড়ি দিয়ে গরাদের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে।
উদ্দীপকের আদিত্য ও আদিবার সঙ্গে 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের অপু-দুর্গার দুরন্তপনার দিক থেকে বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে গ্রামীণ প্রকৃতিতে বেড়ে ওঠা দুটি শিশুর পরিচয় পাওয়া যায়, এরা হলো হরিহর ও সর্বজয়া দম্পতির দুই সন্তান অপু ও দুর্গা। তারা দুজনই খুব দুরন্ত। গ্রামের সর্বত্র তারা ছুটে বেড়ায়। এ দুজনের মধ্যে দশ-এগারো বছর বয়সি দুর্গা চরিত্রটির দুরন্তপনাই মুখ্য। সে মায়ের নিষেধ অমান্য করে বনে-বাদাড়ে ঘুরে নানা ফল কুড়িয়ে এনে ছোট ভাই চঞ্চল অপুকে নিয়ে খায়। সে মায়ের শাসনের সময় চুপ থাকে, পরক্ষণেই তা ভুলে যায়। শিশুর দুরন্তনার চিরচন্তন রূপটি লেখক তার চরিত্রর মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন।
উদ্দীপকে গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা আদিত্য ও আদিবা সার্বক্ষণিক মোবাইল ফোনে মেতে থাকে। তাছাড়া টেলিভিশনে খেলা দেখাও তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঘর থেকে তারা বেরুতেই চায় না। অন্যদিকে 'আম-আঁটির ভেপু' গল্পের অপু ও দুর্গা সারা দিন বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। আম কুড়িয়ে এনে মায়ের দৃষ্টির আড়ালে নুন ও তেল দিয়ে মেখে খায়। গঙ্গা-যমুনা খেলার জন্য বুনোফল সংগ্রহ করে। অর্থাৎ অপু ও দুর্গার মধ্যে যে দুরন্তপনা লক্ষ করা যায়, তা উদ্দীপকের আদিত্য ও আদিবার সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের সর্বজয়া চরিত্রে বাঙালি মায়ের যে শাশ্বত রূপের প্রতিফলন ঘটেছে, তার সঙ্গে মিল থাকায় “উদ্দীপকের আনোয়ারা বেগম যেন 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের সর্বজয়ার যথার্থ প্রতিনিধি” মন্তব্যটি যথার্থ।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের শাশ্বত এক মাতৃরূপ সর্বজয়া। তার দুটি সন্তান। অপু ও দুর্গা। দুর্গা দশ-এগারো বছরের দুরন্ত কিশোরী। সে সারা দিন বাড়ির বাইরে বাইরে থাকে। বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে নানা ফল সংগ্রহ করে। তারপর সেগুলো বাড়িতে এনে ছোট ভাই অপুর সঙ্গে ভাগ করে খায়। মেয়ের এমন দুরন্তপনায় মা সর্বজয়া ভীষণ বিরক্ত হলেও সন্তানদের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। স্নেহ ও শাসনের সন্নিবেশে সর্বজয়া হয়ে উঠেছে গ্রামীণ বাঙালি মায়ের শাশ্বত রূপ।
উদ্দীপকের আনোয়ারা বেগম তার ছেলেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। কখনো আদর করে, কখনোবা রাগ করে মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে তাদের দূরে রাখার জন্য চেষ্টা করেন। 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের সর্বজয়ার মধ্যেও অপু ও দুর্গাকে নিয়ে একইভাবেই চিন্তিত হতে দেখি। এদিক থেকে বিলকিস বেগম সর্বজয়ার যথার্থ প্রতিনিধি।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে সর্বজয়ার ছেলে অপু এবং মেয়ে দুর্গা সুযোগ পেলেই বাড়ির বাইরে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বিশেষ করে দুর্গা মায়ের কোনো কথাই শোনে না। সে তার নিজের খেয়াল খুশিমতো চলে। অন্যের গাছের আম কুড়িয়ে খায়। ছোট ভাই অপুর সঙ্গে খুনশুটি করে। মাকে সে কোনো কাজেই সহযোগিতা করে না। পরিবারের প্রতি তার কোনো দায়িত্ববোধই নেই। এগুলো দেখে সর্বজয়া খুবই চিন্তিত হয়। দুর্গাকে বকাঝকা করে। স্বামী হরিহরের কাছে সে মেয়ের ব্যাপারে নালিশ জানায়। চৈত্র মাসের রোদে ঘুরে মেয়ে জ্বরে পড়তে পারে - এ আশঙ্কায় তার চিন্তাও হয়। অত বড় মেয়েকে সে কোনোভাবেই তার দুরন্তপনাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। ফলে তার মধ্যে সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করে, যা উদ্দীপকের বিলকিস বেগমের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। তাই বলা যায়, প্রদত্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
