পোলিও আক্রান্ত হয়ে শাহানের বাম পা বাঁকা হয়ে গেছে। হাঁটতে তার খুব কষ্ট হয়, স্কুলে যাওয়ার জন্য সবার আগে ঘর থেকে বেরিয়েও সে সময়মতো স্কুলে পৌছতে পারে না। রাস্তায় বেশ কয়েকবার বসতে হয়, তবুও প্রচন্ড ব্যথা হয়, দেরি হয়ে গেলে প্রায়ই সে স্কুলে যায় না। স্কুলের পাশের প্রকান্ড মাঠের কোণে বসে সারাক্ষণ আকাশের পানে চেয়ে থাকে। শ্রমজীবী বাবাকে এ কথা জানালে তিনি বলেন, ‘এ সবই তার স্কুল কামাইয়ের অজুহাত।’- এতে শাহান খুব কষ্ট পায় এবং কাঁদতে শুরু করে।
সুভা দিনে তিনবার গোয়ালঘরে যেত।
'প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়'- বলতে প্রকৃতির সঙ্গে সুভার গভীর সম্পর্ক এবং তার ভাষার অভাব পূরণে প্রকৃতির ভূমিকাকে বোঝানো হয়েছে।
নদীর কলধ্বনি, পাখির ডাক, মাঝির গান, লোকের কোলাহল ইত্যাদি দিয়ে প্রকৃতি সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়। সে সময় পেলেই নদীর পাড়ে এসে বসে। তখন প্রকৃতির নানান উপাদান নিজের সমন্ত ভাষা নিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সুভার হৃদয়ে আছড়ে পড়ে। এই ভাষার বিস্তার যেন বিশ্বব্যাপী। এভাবেই প্রকৃতি বিভিন্ন শব্দের মধ্য দিয়ে সুভার ভাষার অভাব পূরণ করে দেয়।
উদ্দীপকের শাহানের বাবা ও 'সুভা' গল্পের সুভার বাবার মধ্যে সন্তানের কষ্ট-যন্ত্রণাকে উপেক্ষা এবং তাদের মনোবেদনা বুঝতে না পারার দিক থেকে সাদৃশ্য রয়েছে।
'সুভা' গল্পের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মন ও চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতির সুক্ষ্মতর দিকগুলো মমত্বের সঙ্কো উপস্থাপন করেছেন। গল্পে প্রতিবন্ধীদের প্রতি পরিবার ও সমাজের মানুষের নেতিবাচক মানসিকতার দিকটিও উঠে এসেছে। সুভার বাবা সুভাকে ভালোবাসলেও তার কষ্ট, যন্ত্রণা, মনোবেদনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বুঝতে পারেননি এবং সেগুলোকে উপেক্ষা করে গিয়েছেন।
উদ্দীপকে পোলিও আক্রান্ত শাহানের জীবনের কষ্ট-যন্ত্রণা এবং তার পরিবারের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। শাহানের বাবা একজন শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ। তার সন্তান পোলিও আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সে তা বুঝতে পারে না। এ কারণেই শাহান নিজের কষ্টের কথা বললে সে শাহানকে বলে এ সবই তার স্কুল কামাইয়ের অজুহাত। পিতা হয়েও সে শাহানের মনোবেদনা বুঝতে পারেনি। 'সুভা' গল্পের সুভার বাবা বাণীকণ্ঠ সুভাকে আদর করেন। সন্তানের অসুস্থতা তাকে দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন করে। বয়স হলেও সুভাকে পাত্রস্থ করতে না পারায় গ্রামের মানুষের কটু কথা শুনে চুপ থাকেন। অবশেষে একঘরে করার হুমকিতে শুভাকে পাত্রস্থ করার জন্য তাকে নিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমানোর আয়োজন করেন। তখন সুভা ভীষণ মনঃকষ্টে ভোগে। কারণ সে তার চেনা পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। বাবাকে সে তার কষ্টের কথা বোঝাতে চেষ্টা করে। বাবার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ে কান্না করে। অথচ বাবা তার মনোবেদনা বুঝতে পারেন না। উভয় ক্ষেত্রেই অসুস্থ সন্তানের অসহায়ত্ব ও মনোবেদনা বুঝতে না পারার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।
"উদ্দীপকের শাহান যেন 'সুভা' গল্পের মতোই সামাজিক অবস্থার শিকার"- 'সুভা' গল্প অনুযায়ী মন্তব্যটি যথার্থ। কেননা সুভা যেমন পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলা, অবজ্ঞা এবং নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, শাহানও তাই।
'সুভা' গল্পে সবাই সুভাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখত। সে কথা বলতে পারত না বলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সামনেই নেতিবাচক দুশ্চিন্তা করত। সুভার সঙ্গে কেউ খেলত না বলে সে ছিল নিঃসঙ্গ। সুভার মা তাকে গর্তের কলঙ্ক মনে করে বিরক্ত ছিলেন। বাবা তাকে ভালোবাসলে ও তার মনের কষ্ট তিনি বুঝতে পারেননি। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সে নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে সব সময়।
'সুভা' গল্পে সুভা বাক্প্রতিবন্ধী, সে কথা বলতে পারে না। এ কারণে শৈশব থেকেই সে অবহেলার শিকার। সমবয়সিরা তাকে খেলায় নেয় না, তার সঙ্গে মেশে না, কথা বলতে চায় না। প্রতিবেশীরা তার সামনেই তার প্রতিবন্ধিতা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে। সুভার মা সুভাকে তার গর্ভের কলঙ্ক মনে করেন। ফলে সুভা নির্বাক প্রকৃতির কাছে তার মুক্তির আনন্দ খোঁজে। নির্বাক হওয়ায় বাবা বাণীকণ্ঠ মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পারেন না। তাই নিরুপায় হয়ে সুভার বিয়ের কথা ভেবে তাকে নিয়ে কলকাতায় যাওয়ার আয়োজন করেন। 'সুভা' গল্পে সুভার এমন সামাজিক অবস্থার সঙ্গে উদ্দীপকের শাহানের সামাজিক অবস্থানের মিল রয়েছে। শাহান পোলিও আক্রান্ত হয়েছে বলে সমাজে অবহেলিত। বাম পা বাঁকা হয়ে যাওয়ার কারণে তার হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হয়। সবার আগে ঘর থেকে বের হয়েও সে সময়মতো স্কুলে পৌঁছতে পারে না। ক্লান্ত হয়ে স্কুলের পাশের মাঠের এক কোণে বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। তার কষ্টের কথা পরিবারের কেউ অনুধাবন করতে চায় না।
'সুভা' গল্পে সুভাকে তার মা যেমন মেনে নিতে পারেন না তেমনই সমাজের মানুষের কাছেও সে অবহেলিত থাকে। প্রতাপও কেবল ছিপ ফেলে মাছ ধরার সময় নির্বাক সঙ্গী হিসেবেই তাকে দেখত, সুভার কষ্ট বা মনোবেদনা অনুধাবন করত না। উদ্দীপকের শাহানের কষ্টও কেউ বুঝতে চায়নি। এমনকি বাবাও শাহানকে অবিশ্বাস করেছেন। ঠিক সময়ে স্কুলে না যেতে পারাকে স্কুল কামাইয়ের অজুহাত মনে করেছেন। এসব দিক বিচারে তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
