স্বপ্না সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। লেখাপড়ায় যেমন ভালো খেলাধুলাতেও তেমনি। এজন্য সহপাঠীরা স্বপ্নাকে খুব ভালোবাসত। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি হাত ও একটি পা হারাতে হয় তাকে। এতে স্বপ্না মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। সবার সামনে আসতে বিব্রত বোধ করে। লেখাপড়া যে আর হবে না সেও তার পরিবার নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু তার সহপাঠীরা সান্ত্বনা, সহযোগিতা আর সাহস দিয়ে তাকে আবার লেখাপড়ার ব্যাপারে উৎসাহী করে তোলে। এই স্বপ্নাই একদিন এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে স্কুলের সুনাম বৃদ্ধি করে।
সুভা জলকুমারী হলে জল থেকে উঠে সাপের মাথার মণি প্রতাপের জন্য ঘাটে রেখে যেত।
'আমি তোমার কাছে কী দোষ করেছিলাম?'- উক্তিটি দ্বারা সুভার ব্যথিত হৃদয়ের আক্ষেপ বোঝানো হয়েছে।
সুভা বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় বিয়ের জন্য পাত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার বাবা-মা কলকাতায় যাওয়ার আয়োজন করে। তখন একমাত্র ভাষাবিশিষ্ট প্রাণী, প্রতাপকে ছেড়ে যেতে সুভার কষ্ট লাগে। প্রতাপ যখন বলে "কী রে সু, তোর নাকি পাত্র পাওয়া গেছে, তুই নাকি বিয়ে করতে যাচ্ছিস? দেখিস আমাদের ভুলিস নে" তখন প্রতাপের এই কথা সুভার অন্তরে মর্মবিদ্ধ হরিণীর তীরের মতো আঘাত হানে। মূলত কাছের বন্ধু প্রতাপের কাছ থেকেও এ ধরনের ইঙ্গিতময় কথা ছিল সুভার কাছে অপ্রত্যাশিত। এ প্রসঙ্গেই একথা বলা হয়েছে।
উদ্দীপকে স্বপ্নার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার দিকটি 'সুভা' গল্পের সুভার নিজেকে আড়াল করার মানসিক অবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
'সুভা' গল্পে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মন ও চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতির সুক্ষ্মতর দিকগুলো উপস্থাপন করেছেন। এখানে সুভা বাক্প্রতিবন্ধী এক কিশোরী। মা-বাবার কাছে সে নীরব হৃদয়ভার। কথা বলতে পারে না বলে সবাই তার সামনেই দুশ্চিন্তা করে এমন সব কথা বলত যে সে নিজেকে বিধাতার অভিশাপ মনে করত এবং সবার কাছ থেকে আত্মগোপন করে থাকতে চাইত। তার সঙ্গে কেউ মিশত না, খেলত না। সে ছিল নিঃসঙ্গ।
উদ্দীপকের স্বপ্না পড়ালেখা ও খেলাধুলায় ভালো। সহপাঠীদের ভালোবাসায় ভালোই কাটছিল সময়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সড়ক দুর্ঘটনায় সে এক হাত ও এক পা হারায়। এর ফলে সমাজের মানুষের অবহেলা, অবজ্ঞার কথা ভেবে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মূলত শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কোনো দোষের না হলেও সমাজের মানুষের বিরূপ আচরণের শঙ্কায় স্বপ্না মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। উদ্দীপকের স্বপ্নার সঙ্গে 'সুভা' গল্পের সুভার সাদৃশ্য রয়েছে। সুভা বাক্প্রতিবন্ধী। মা তাকে গর্ভের কলঙ্ক মনে করেন। সে পিতা-মাতার নীরব দুশ্চিন্তার কারণ। তাই সে নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে গুটিয়ে রাখে। তাই মানসিকভাবে বিপর্যন্ত সুভার স্বাভাবিক বিকাশ হয়নি। নিজেকে সব সময় পিতা-মাতা ও সমাজের কাছে বোঝাস্বরূপ মনে হয়েছে। নির্জন দুপুরের নিস্তব্ধতার মতোই সুভা একাকী। এভাবে উদ্দীপকের স্বপ্না ও 'সুভা' গল্পের সুভার মানসিক অবস্থা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ।
"সুভার প্রতি সমাজের মানসিকতা যদি উদ্দীপকের মতো হতো তাহলে 'সুভা' গল্পের সুভার পরিবারকে এত বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো না" মন্তব্যটি যথার্থ। কেননা সহানুভূতি পেলে সুভা সফল জীবন পেত এবং তার পবিরারও নির্ভার থাকত।
'সুভা' গল্পের সুভা বাক্প্রতিবন্ধী এক কিশোরী। সাধারণ মানুষের চেয়ে তার সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বেশি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে প্রতিকূল পরিবেশ পেয়েছে। সমবয়সিরা কেউ তার সঙ্গে খেলত না। সবাই তার সামনে তার বিষয়ে দুশ্চিন্তা করত। সুভার বয়স একটু বাড়লে সমাজের লোকজন নিন্দা শুরু করে। এমনকি সুভার বাবাকে এক-ঘরে করার জনরবও ওঠে। সমাজের এসব প্রতিকূলতায় পরিবারও সমস্যায় পড়ে এবং তাকে বিয়ে দিতে কলকাতায় নিয়ে যায়। উদ্দীপকের স্বপ্না সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাত ও এক পা হারিয়ে সমাজের অবহেলার আশঙ্কায় মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়ে। কিন্তু সহপাঠীদের ঐকান্তিক সহানুভূতি ও সাহস তাকে তার লক্ষ্যে পৌছাতে সাহায্য করে। এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পেছনে কাজ করে সহপাঠীদের সহযোগিতামূলক আচরণ। 'সুভা' গল্পের সুভার পরিবেশ, সমাজ উলটো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সুভার জীবনের করুণ পরিণতির জন্য পরিবারে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং মায়ের বিরূপ আচরণ দায়ী। প্রতাপও তাকে সহানুভূতি দেখায়নি। বিয়ের পাত্রের সন্ধানে সুভার বাবা-মা তাকে নিয়ে কলকাতা যাত্রা করলে, চারপাশের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে যেতে সে কষ্ট পেয়েছে। উদ্দীপকে স্বপ্নার সহপাঠীদের মতো সুভা যদি সহযোগিতামূলক আচরণ ও সহানুভূতি পেত তাহলে তাকে নিজ মাতৃভূমি ছাড়তে হতো না। সুভার জীবনও উদ্দীপকের স্বপ্নার মতো এক সুন্দরতম সুখময় পরিণতির দিকে অগ্রসর হতো।
উদ্দীপকের স্বপ্না সহপাঠীদের সহযোগিতায় শারীরিক প্রতিবন্ধিতা জয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 'সুভা' গল্পের সুভা সামাজিক প্রতিকূল পরিবেশের কারণে পরিবারে দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এবং মাতৃভূমি ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সুভার পরিবারকে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
