রেচন: রেচন মানব দেহের একটি জৈবিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দেহে বিপাক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বর্জ্য পদার্থগুলো নিষ্কাশিত হয়।
মানুষের শরীরে বিভিন্ন বিপাক ক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্য পদার্থ রক্তের সাথে বৃক্কের গ্লোমেরুলাসে আসে। সেখান থেকে বর্জ্য পদার্থগুলো যেমন- ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, ক্রিয়েটিনিন প্রভৃতি বৃক্কের রেনাল টিউব্যুলে চলে আসে এবং মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন: রক্তকণিকা, প্লাজমা প্রোটিন রক্তনালীতে থেকে যায়। রক্তকে ছেঁকে বর্জ্য পদার্থ বের করে আনে বলে বৃক্ককে মানবদেহের ছাঁকনি বলা হয়।
উদ্দীপকে অঙ্গটি হচ্ছে বৃক্ক। নিম্নে বৃক্কের গঠন ব্যাখ্যা করা হলো-মানবদেহের রেচন অঙ্গ হলো বৃদ্ধ বা কিডনি। মানবদেহের উদরগহ্বরের পিছনের অংশে, মেরুদণ্ডের দুদিকে বক্ষপিঞ্জরের নিচে পৃষ্ঠপ্রাচীর সংলগ্ন অবস্থায় দুটি বৃদ্ধ অবস্থান করে। প্রতিটি বৃক্কের আকৃতি শিমবিচির মতো এবং রং লালচে হয়। বৃক্কের বাইরের দিক উত্তল ও ভেতরের দিক অবতল হয়। অবতল অংশের ভাঁজকে হাইলাস বলে। হাইলাসে অবস্থিত গহ্বরকে পেলভিস বলে।
বৃক্ক সম্পূর্ণরূপে এক ধরনের তন্ত্রময় আবরণী দিয়ে বেষ্টিত থাকে। একে রেনাল ক্যাপসুল বলে। ক্যাপসুল সংলগ্ন অংশকে কর্টেক্স এবং ভেতরের অংশকে মেডুলা বলে। মেডুলায় সাধারণত ৮-১২টি রেনাল পিরামিড থাকে। এদের অগ্রভাগ প্রসারিত হয়ে প্যাপিলা (Papilla) গঠন করে। এসব প্যাপিলা (Papilla) সরাসরি পেলভিসে উন্মুক্ত হয়। প্রতিটি বৃক্কে বিশেষ এক ধরনের নালিকা থাকে, যাকে ইউরিনিফেরাস নালিকা বলে। প্রতিটি ইউরিনিফেরাস নালিকা দুটি প্রধানে অংশে বিভক্ত; যথা- নেফ্রন ও সংগ্রাহী নালিকা। নেফ্রন মূত্র তৈরি করে আর সংগ্রাহী নালিকা রেনাল পেলভিসে মূত্র বহন করে।
উদ্দীপকের অঙ্গটি হলো মানবদেহের প্রধান রেচন অঙ্গ বৃক্ক বা কিডনি। বৃক্ক অকার্যকর হলে তার প্রতিকারের উপায়গুলো হলো ডায়ালাইসিস অথবা প্রতিস্থাপন। নিম্নে বৃক্ক বিকল হলে করণীয় কাজ
বর্ণনা করা হলো:
ডায়ালাইসিস:বৃক্ক সম্পূর্ণ অকেজো বা বিকল হবার পর বৈজ্ঞানিক উপায়ে রক্ত পরিশোধিত করার নাম ডায়ালাইসিস। 'সাধারণত 'ডায়ালাইসিস মেশিনের' সাহায্যে রক্ত পরিশোধিত করা হয়। এ মেশিনের ডায়ালাইসিস টিউবটির এক প্রান্ত রোগীর হাতের কব্জির ধমনির সাথে এবং অন্য প্রান্ত ঐ হাতের কব্জির শিরার সাথে সংযোজন করা হয়। ধমনি থেকে রক্ত টিউবটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করানো হয়। এর প্রাচীর আংশিক বৈষম্যভেদ্য হওয়ায় ইউরিয়া, ইউরিক এসিড ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ বাইরে বেরিয়ে আসে। পরিশোধিত রক্ত রোগীর দেহের শিরার মধ্য দিয়ে দেহের ভিতর পুনরায় প্রবেশ করে। এখানে উল্লেখ্য যে ডায়ালাইসিস টিউবটি এমন একটি তরলের মধ্যে ডুবানো থাকে, যার গঠন রক্তের প্লাজমার অনুরূপ হয়। এভাবে ডায়ালাইসিস মেশিনের সাহায্যে নাইট্রোজেন জাতীয় ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ (ইউরিয়া এবং অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ) বাইরে নিষ্কাশিত হয়। তবে এটি একটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
প্রতিস্থাপন: যখন কোনো ব্যক্তির কিডনি বিকল বা অকেজো হয়ে পড়ে তখন কোনো সুস্থ ব্যক্তির কিডনি তার দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়, তখন তাকে কিডনি সংযোজন বলে। কিডনি সংযোজন দুভাবে করা যায়- কোনো নিকট আত্মীয়ের কিডনি অথবা কোনো মৃত ব্যক্তির কিডনি রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়। নিকট আত্মীয় বলতে বাবা, মা, ভাইবোন, মামা, খালাকে বোঝায়। মৃত ব্যক্তি বলতে 'ব্রেন ডেড' মানুষকে বোঝায়, যাঁর আর কখনোই জ্ঞান ফিরবে না কিন্তু তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কৃত্রিমভাবে জীবিত রাখা হয়েছে। তাছাড়া মরণোত্তর চক্ষুদানের মতো মরণোত্তর বৃক্কদানের মাধ্যমে একজন কিডনি বিকল বা অকেজো রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভবপর হয়। মানুষের একটি কিডনি কার্যক্ষম থাকলেই সেটি দিয়ে জীবনধারণ করা সম্ভব। তাই একটি সুস্থ কিডনি প্রতিস্থাপন করে রোগের চিকিৎসা করা যায়। তবে দেখতে হবে যে টিস্যু ম্যাচ করে কিনা। পিতামাতা, ভাইবোন এবং নিকট আত্মীয়ের কিডনির টিস্যু ম্যাচ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
