প্রতিবছর বন্যায় বাঁধ ভেঙ্গে গ্রাম প্লাবিত হয়। রক্ত পানি করা সোনার ফসল, মানুষ, গোরু সব বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দৈববিশ্বাসের ওপর ভর করে গ্রামের মাতব্বর রহিম সর্দার এবার বাঁধ রক্ষার জন্য চাষিদেরকে একজন নামকরা পিরের শরণাপন্ন হতে পরামর্শ দেন। পক্ষান্তরে গ্রামের শিক্ষিত যুবক মতি মাস্টার একদল লোক নিয়ে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে রাতের মধ্যেই মাটি কেটে বাঁধ মজবুত করে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় গ্রামের মানুষের কষ্টের সোনার ফসল।
নাটকের প্রাণ হলো সংলাপ।
'নতুন এক জীবনের স্বাদ পেয়েছি।'- কথাটি জমিদার হাতেম আলি বলেছেন।
জমিদার হাতেম আলি জমিদারি রক্ষা করার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না। বহিপীর তাকে সেই টাকা কর্জ দিয়ে বিনিময়ে তাহেরাকে সঙ্গে নেওয়ার প্রস্তাব করেন। এই প্রস্তাবে জমিদারের স্ত্রী খোদেজা রাজি হলেও হাতেম আলি বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেন। হাশেমের কাছে সব শুনে তিনি যখন বিষয়টি বুঝতে পারেন তখন বহিপীরের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি বহিপীরকে বলেন, "আমি এভাবে টাকা নিতে পারব না। যায় যাক জমিদারি।" তখন বহিপীর জানতে চান, কথাটি তিনি ভেবে বলেছেন কি না। হাতেম আলি তাকে জানান যে, হঠাৎ তার সব ভয়-ভাবনা কেটে গেছে এবং তিনি এক নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছেন।
উদ্দীপকের রহিম সর্দারের পরামর্শ 'বহিপীর' নাটকের পীরের প্রতি অন্ধ অনুকরণের দিকটি ইঙ্গিত করে।
'বহিপীর' নাটকে বহিপীরের অসংখ্য অনুসারী রয়েছে। তার অনুসারীরা তাকে সারাক্ষণ অন্ধ অনুকরণ করে থাকে। মূলত তার অনুসারীরা সচেতন নয়। তাদের মনে কুসংস্কার জড়িয়ে আছে। এজন্য তারা সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় অনুধাবন করতে পারে না। পীরের খেদমত করাকেই তারা ধর্মীয় কাজ মনে করে। কিন্তু পিরপ্রথার সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ভণ্ডপীরেরা ধর্মের লেবাস পরে ধর্মপ্রাণ মানুষদের সাথে ধোকাবাজি করে। অথচ সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। 'বহিপীর' নাটকের তাহেরার বাবা-মা বহিপীরের অন্ধভক্ত। এজন্য তারা তাহেরাকে বহিপীরের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল। আবার জমিদার হাতেম আলির স্ত্রী খোদেজাও বহিপীরের অন্ধ অনুসারী।
উদ্দীপকে প্রতি বছর বন্যার বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বন্যার পানি মানুষের বাড়ি-ঘর, ফসল, গোরু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এ থেকে পরিত্রাণের আশায় গ্রামের মাতবর রহিম সর্দার সবাইকে একটি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন বন্যার পানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন নামকরা পীরের শরণাপন্ন হতে হবে। উক্ত পীর বন্যার হাত থেকে গ্রামবাসীদের রক্ষা করবে। উদ্দীপকের রহিম সর্দারের ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করার ক্ষমতা কোনো পীরের নেই। অথচ গ্রামের অশিক্ষিত লোকেরা এসব ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। গ্রামের মানুষ কুসংস্কারে বিশ্বাসী হওয়ায় তারা পীরের অন্ধ অনুকরণ করে থাকে। তাই উদ্দীপকের রহিম সর্দারের পরামর্শটি 'বহিপীর' নাটকের পীরের প্রতি অন্ধ অনুকরণের দিকটি ইঙ্গিত করে।
উদ্দীপকের মতি মাস্টার ও 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি সমার্থক চরিত্র হয়ে উঠেছে বলেই আমি মনে করি।
'বহিপীর' নাটকে বহিপীরের অসংখ্য অন্ধ অনুসারী রয়েছে। তবে সবাই তার অন্ধ অনুসারী নয়। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ রয়েছে যারা ভণ্ড পীরের ভণ্ডামিতে বিশ্বাসী নয়; বরং পীরের ভণ্ডামিকে প্রতিহত করতে চায়। কিন্তু তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সাহসী মনোভাব নিয়ে পীরের অপকর্ম বন্ধ করার জন্য অনেকেই এগিয়ে আসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভন্ড পীরেরা ধর্মের লেবাস ধারণ করে তারা মানুষকে ধোকা দেয়। 'বহিপীর' নাটকে বহিপীরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় হাশেম আলি। সে পীরের অপকর্মে বাধা দেয়। বহিপীর জোরপূর্বক তাহেরাকে বিয়ে করতে চাইলে হাশেম আলি এর তীব্র বিরোধিতা করে। সে তাহেরাকে বহিপীরের হাত থেকে বাঁচায়। 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি আত্মসচেতন ও কুসংস্কারমুক্ত একটি চরিত্র।
উদ্দীপকে বন্যার হাত থেকে গ্রামবাসীকে রক্ষা করার জন্য রহিম সর্দার একজন নামকরা পীরের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রহিম সর্দারের এ পরামর্শে পিরের প্রতি তার অন্ধ অনুকরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু উদ্দীপকের মতি মাস্টার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে পীরের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী নয়। সে শিক্ষিত, আত্মসচেতন একজন মানুষ। সে পেশায় একজন শিক্ষক। তাই গ্রামবাসীকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একদল লোক নিয়ে কাজে নেমে পড়ে। প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে রাতের মধ্যেই মাটি কেটে বাঁধ মজবুত করে। তার দুঃসাহসিক কাজের মাধ্যমে মারাত্মক বন্যা থেকে গ্রামটি রক্ষা পায়। রক্ষা পায় গ্রামের মানুষের ফলানো সোনার ফসল ও গোরু-ছাগল।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকের মতি মাস্টার ও 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি সমার্থক চরিত্র হয়ে উঠেছে। দুজনের কাজের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন হলেও কাজের উদ্দেশ্য ও ফলাফল মূলত এক ও অভিন্ন। তারা দুজনেই ভণ্ড পীরের অনুকরণমুক্ত। তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত রুচিবান মানুষ। এজন্য ধর্মীয় কুসংস্কার তাদেরকে গ্রাস করতে পারেনি। 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি বহিপীরের হাত থেকে তাহেরাকে রক্ষা করেছে। তাহেরার অনিশ্চিত জীবনের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছে। অপরদিকে উদ্দীপকের মতি মাস্টার মাটি কেটে বাঁধ মজবুত করে বন্যার হাত থেকে গ্রামবাসীদের রক্ষা করেছে। সে কোনো পীরের শরণাপন্ন হতে যায়নি। সুতরাং উদ্দীপকের মতি মাস্টার ও 'বহিপীর' নাটকের হাশেম আলি সমার্থক চরিত্র হয়ে উঠেছে বলেই আমি মনে করি।
