৮ম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী রূপা চার বছর আগে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাবা-মা হারিয়ে চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে চাচাতো ভাইবোনদের সঙ্গে পড়ালেখা করছে। অত্যন্ত মেধাবী বলে তার পড়াশোনা মেনে নিতে পারে না চাচি। চাচি রূপার বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগে। শেষ পর্যন্ত, চাচাকে রাজি করিয়ে এক মধ্য বয়সি ফল ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে ফেলে। বিয়ে নিশ্চিত জেনে রূপা নিরুপায় হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয়।
জমিদার পুত্র হাশেম ছাপাখানা দিতে চেয়েছিল।
জমিদার হাতেম আলির জমিদারি ঘুচে যাওয়ায় তার মানসিক অবস্থাকে বিবেচনা করে হাশেম আলি উক্তিটি করেছে।
সূর্যাস্ত আইনে জমিদারি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে হাতেম আলির। বন্ধু আনোয়ারের কাছে এসেও তাকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় জমিদারি হারানোর বিষয়ে সে নিশ্চিত এবং একথা সে তার পুত্র হাশেমকে বলেছে। হাশেম আলি এ সংবাদে ভীষণ আহত হওয়ার পাশাপাশি পিতার মানসিক অবস্থাও বুঝতে পেরেছে। তাই আলোচ্য কথাটি দ্বারা সে পিতার মানসিক অবস্থাকে তুলে ধরেছে।
উদ্দীপকের রূপার বিয়ে ‘বহিপীর’ নাটকের তাহেরার বৃদ্ধ পিরের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ সামাজিক সমস্যাকে চিহ্নিত করে।
‘বহিপীর’ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র তাহেরা। মাতৃহারা এ মেয়েটিকে তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবা ও সৎমা মিলে এক বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বাবা-মার একটা বিশ্বাস পিরের সাথে বিয়ে দিলে তারা পরপারে লাভবান হবেন। এমনই একটা প্রথা প্রচলিত ছিল তৎকালীন সমাজে। আর বেশিরভাগ মেয়েই নীরবে সেটা তাদের ভাগ্য বলে মেনে নিত। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম তাহেরা। সে এ অন্যায় বিয়ে মেনে নেয়নি। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা বা লোকলজ্জার ভয় দূরে ঠেলে এক প্রতিবাদী সিদ্ধান্ত নেয়। গোপনে পালিয়ে যায়। ভবিষ্যত না ভেবে তীব্র প্রতিবাদ নিয়ে শহরগামী বজরায় চড়ে বসে। বলতে গেলে তাহেরা এক অনমনীয় চরিত্র।
অন্যদিকে উদ্দীপকেও আমরা দেখি এক প্রতিবাদী চরিত্র রূপাকে। বাবা-মা হারা এ কিশোরী কোনোভাবেই মধ্যবয়সী ফল বিক্রেতার সাথে বিয়েকে মেনে নিতে পারেনি। চাচা-চাচির এ শঠতার জোরে রূপা অসহায় হয়ে পড়ে। তবে সে দমে যায়নি। শেষ পর্যন্ত মেধাবী এ ছাত্রী নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে নিরুপায় হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয়। বর্তমান প্রক্ষাপটে এটা তার অধিকার। তাছাড়া প্রচলিত আইনও রূপাকে সমর্থন দিবে। তাই বলা যায়, অসমবিয়ে তৎকালীন সমাজের একটি সামাজিক সমস্যা। যেটা আজও বহমান, তবে তার মাত্রা অনেকটা কমেছে।
‘বহিপীর’ নাটকের তাহেরা যদি উদ্দীপকের রূপার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো তাহলে নাটকের পরিণতি ভিন্ন হতে পারতো। তবে বর্তমান সময়ের মতো তৎকালীন সমাজব্যবস্থা বা পারিপার্শ্বিকতা অনুকূল ছিল না।
বহিপীর নাটকটি ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। আর নাটকের প্রক্ষাপট হয়তোবা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের। যেসময় ছিল নানা ধর্মীয় কুসংস্কার ও পির সম্প্রদায়ের দখলে। সেই সময়ে মেয়েদেরকে বোঝা মনে করা হতো। নারী মানে ঘরের দাসী, পুরুষের সেবিকা। তাদের নিজস্ব কোনো মতামত গ্রহণযোগ্য হবার সুযোগ খুব কমই ছিলো। তবে এসবের মধ্যে এক প্রতিবাদী চেতনা নিয়ে আবির্ভূত হয় তাহেরা। বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ে করার থেকে জীবনের অনিশ্চিত পথ তার কাছে শ্রেয় মনে হয়েছিল। তাইতো কোনো কিছু না ভেবে শহরের বজরায় আশ্রয় নিয়েছিলো। তার ব্যক্তিত্ব অনমনীয় তবে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের আশ্রয় নেয়ার কথা ভাবেনি; বরং অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোকে শ্রয় মনে করেছে।
অন্যদিকে আমরা উদ্দীপকের রূপাকে দেখি, নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে। সে তখন লোক-লজ্জার বা চাচা-চাচির কথা ভাবেনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তথা আইনের আশ্রয়ে সে নিজেকে সপে দিয়েছে। মুক্তি পেতে চেয়েছে বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে। চেয়েছে লেখাপড়া শিখে নিজের মতো করে জীবন সাজাতে। রূপা অন্যরকম প্রতিবাদী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে হয়তো লেখাপড়া করার কারণে বা বর্তমান সমাজব্যবস্থার অগ্রগতি সম্পর্কে জানা থাকার কারণে।
নাটকের তাহেরা যদি রূপার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো তা হলে হয়তো বা নাটকের পরিণতি আরো আগেই হতো। নয়তো বহিপীরের ভডামী বা তার দোসরদের কঠিন বিচারের মুখোমুখী হতে হতো।
