রাফিন সংবাদপত্র খুলে প্রথমেই ‘আজকের দিনটা কেমন যাবে’ কলামটিতে চোখ না বুলিয়ে ঘর থেকে বের হন না। ঘর থেকে বেরোবার সময় অসাবধানতাবশত হোঁচট খেলে বা হাঁচি দিলে, খানিকটা সময় বসে তারপর বাড়ি থেকে বের হন।
বহিপীরের মতে, পীরের গায়ে কোনো বদদোয়া লাগে না।
হাতেম আলি তার ছেলে হাশেমের ছাপাখানার স্বপ্ন নস্যাৎ হওয়া সম্পর্কে একথা বলেছেন।
হাতেম আলি জমিদারি বাঁচানোর জন্য ছেলে ও স্ত্রীকে অসুখের মিথ্যা কথা বলে শহরে আসেন টাকা জোগাড় করতে। চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে তাকে জমিদারির আশা ছেড়ে দিতে হয়। তার ছেলে হাশেমের খুব আশা ছিল যে, সে একটা ছাপাখানা দেবে। হাতেম আলি ছেলেকে ছাপাখানা স্থাপন করার টাকা দেবেন। কিন্তু জমিদারি চলে গেলে হাতেম আলি আর ছাপাখানা ব্যবসায়ের জন্য টাকা দিতে পারবেন না। তখন তার ছেলের আশা ভঙ্গ হবে, সে কষ্ট পাবে। এটি বোঝাতেই হাতেম আলি প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের দিক থেকে উদ্দীপকটি ‘বহিপীর’ নাটকের সাথে সম্পর্কিত।
‘বহিপীর’ নাটকে পিরপ্রথার ভয়াবহতা ও কদর্য রূপ বর্ণিত হয়েছে। নাটকে পিরপ্রথার ধারক ও বাহক বহিপীর মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে ঠকায়। তার মুরিদরা তার সেবা করার জন্য পাগল। ধনসম্পদ থেকে শুরু করে নিজ কন্যাকে দান করতেও তারা পিছপা হয় না। মূলত নাটকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পতনকে তুলে ধরা হয়েছে।
উদ্দীপকে রাফিন সংবাদপত্র খুলে প্রথমেই ‘আজকের দিনটা কেমন যাবে’ অর্থাৎ রাশিফল কলামটি অবশ্যই দেখে তারপর ঘর থেকে বের হন। যাওয়ার পথে কোনো অমঙ্গলসূচক আচরণ দেখলে কিছুক্ষণ বসে তারপর বের হন। যা আধুনিকতার পরিপন্থি। উদ্দীপকের এরূপ সমাজের বাস্তব রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি পঠিত ‘বহিপীর’ নাটকে। অন্ধ পিরভক্তির কারণে তাহেরার বাবা ও সৎমা মিলে কিশোরী তাহেরাকে বৃদ্ধ পিরের সাথে বিয়ে দেয়। তা না হলে পিরের বদদোয়ায় তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। আবার জমিদার পত্নী খোদেজা পিরের হাত থেকে পালানো তাহেরাকে পুনরায় পিরের হাতে তুলে দিয়ে পুণ্য লাভ করতে ও পিরের বদদোয়া থেকে মুক্ত হতে চায়। আর এভাবেই উদ্দীপকটি ‘বহিপীর’ নাটকের সাথে সম্পর্কিত।
উদ্দীপকটি 'বহিপীর' নাটকের মূলচেতনাকে স্পর্শ করেছে বলেই মনে করি।
'বহিপীর' নাটকটি গড়ে উঠেছে বাঙালি জীবনে পির সম্প্রদায়ের প্রভাবকে কেন্দ্র করে। এ নাটকে বাঙালি মুসলিম সমাজে জেঁকে বসা পিরপ্রথার কথা ওঠে এসেছে। অন্যদিকে ওঠে এসেছে নতুন দিনের প্রতীকস্বরূপ এক বালিকার পিরের প্রতি বিদ্রোহ ও প্রতিবাদী চেতনা।
উদ্দীপকের রাফিন গোড়া কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অনগ্রসর মানসিকতার পরিচায়ক। সে তার নিজস্ব চিন্তাধারার অনুসরক। সে বিশ্বাস করে সংবাদপত্রের 'আজকের দিনটা কেমন যাবে' কলাম। জ্যোতিষির কথাকে সে একবাক্যে বিশ্বাস স্থাপন করে। ঘর থেকে বেরোবার সময় অসাবধানতাবশত হোঁচট খেলে বা হাঁচি দিলে, তখনই বেরিয়ে যায় না। কিছুটা সময় বসে তারপর যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। এমনই মানসিকতা নাটকে তাহেরার বাবা-মা ও জমিদার পত্নী খোদেজার মধ্যে দেখা যায়। তারা পির পুজায় ব্যতিব্যস্ত। পিরের সুনজর পাওয়ার জন্য তাহেরার বাবা-মা নিজের মেয়েকে বিসর্জন দেয়, খোদেজা যে-কোনো মূল্যে পিরের বিরাগভাজন হতে চায় না। 'বহিপীর' নাটকের মূলচেতনা হলো সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরা। যে অসঙ্গতি যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে। কোনো সমস্যার প্রতিকার কিংবা সমাধান নাটকের উদ্দেশ্য নয়। উদ্দীপকটিও কিছু সমস্যা ও অসঙ্গতির বাস্তব চিত্র উপস্থাপক। এটিও কোনো সমস্যার সমাধান নয়। তাই বলা যায় উদ্দীপকটি নাটকের মূলচেতনাকে স্পর্শ করেছে।
