স্তবক-১ : ওরা গরিব ওরা নিঃস্ব পায় না দুবেলা খেতে
ওরা দুর্বল ভীরু-কাপুরুষ পারবে না মাথা তুলে দাঁড়াতে।
স্তবক-২: এ মাটির তলে ঘুমায়েছে অবিরাম
রফিক, শফিক, বরকত কত নাম।
কত তিতুমীর কত ঈসা খান
দিয়েছে জীবন দেয়নি তো মান।
‘সাহসী জননী বাংলা’ কবিতায় চির কবিতার দেশ বলা হয়েছে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কবিতাকেও যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে কবি ‘কবিতার হাতে রাইফেল’ কথাটি বলেছেন।
‘সাহসী জননী বাংলা’ কবিতায় ‘কবিতার হাতে রাইফেল’ কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে কবিতার মাধ্যমেও প্রতিরোধ ও মুক্তির কথা বলা হয়েছে। কবি-সাহিত্যিকদের লেখা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও শক্তি সঞ্চার করেছিল। কবিতাই তখন হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র। এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করতেই কবি আলোচ্য চরণটির অবতারণা করেছেন।
বাঙালিদের নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মনোভাবের দিক থেকে উদ্দীপকের স্তবক-১ এর সাথে 'সাহসী জননী বাংলা' কবিতার ভাবগত মিল লক্ষ করা যায়।
'সাহসী জননী বাংলা' কবিতাটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা। এ কবিতায় কবি বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সামরিক জান্তার আগ্রাসন ও বীর বাঙালির প্রতিরোধ ভূমিকার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। আর তা করতে গিয়ে তিনি বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হীন মনোভাবকেও উপস্থাপন করেছেন। উগ্র স্বাজাত্যবোধের কারণে তারা বাঙালিকে ভেতো ও দুর্বলচিত্তের বলে মনে করতো।
উদ্দীপকের স্তবক-১ এর কবিতাংশে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। সেখানে তাদের গরিব ও খেতে পায় না বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ঘৃণাভরে তাদের ভীরু ও কাপুরুষ আখ্যা দিয়ে ওরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না বলে শ্লেষ প্রকাশ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট এক শ্রেণির হীন মানসিকতাই তাদের এমন মন্তব্যের কারণ। একইভাবে, 'সাহসী জননী বাংলা' কবিতায়ও কবি বাঙালিদের সম্পর্কে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হীন মনোভাবকে উত্থাপন করেছেন। এমন মনোভাবের কারণেই তারা বাঙালিকে ভেতো ও দুর্বল বলে অবজ্ঞা করতো। এদিক থেকে উদ্দীপকের স্তবক-১ এর সাথে 'সাহসী জননী বাংলা' কবিতার ভাবগত মিল পাওয়া যায়।
"স্তবক-২ এর চেতনাই 'সাহসী জননী বাংলা' কবিতার মূল ভিত্তি।"- 'সাহসী জননী বাংলা' কবিতা এবং উদ্দীপকের আলোকে মন্তব্যটি যথার্থ।
'সাহসী জননী বাংলা' কবিতায় পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের অপশাসন ও অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের বীরোচিত ভূমিকাকে অভিনন্দিত করেছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালিকে দুর্বল ভেবে অত্যাচার চালালে এ জাতি তাদের সেই অত্যাচার মুখ বুজে মেনে নেয়নি। বরং অতীতের সংগ্রামের ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে তারা বীরোচিতভাবে তাদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে।
উদ্দীপকের স্তবক-২ এর কবিতাংশে কবি জাতির সূর্যসন্তানদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। তাঁরা জীবন দিয়ে হলেও জাতিকে বহিঃশত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তাদের সেসকল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস আমাদের স্বাধীকার চেতনায় উজ্জীবিত করে। দেশমাতৃকাকে নিয়ে গর্ব করতে গিয়ে স্তবক-২ এর কবি তাই সেই সকল মহান ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ টেনেছেন। আলোচ্য কবিতাতেও কবি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনসহ অনাদি অতীতের বিভিন্ন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
'সাহসী জননী বাংলা' কবিতায় কবি বাঙালি জাতির সুদীর্ঘকালের সংগ্রামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। ইতিহাসের নানা বাঁকে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি এ জাতির উপর আগ্রাসন চালিয়েছে। কিন্তু বাঙালি জাতি সমন্বিত শক্তিতে সেসকল অশুভ শক্তিকে বার বার পরাভূত করেছে। আর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনসহ অনাদি অতীতের সেসকল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাসই বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত করেছে। একইভাবে, উদ্দীপকের স্তবক-২ এর কবিতাংশেও কবি বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাসের সেসকল বীর সেনানীদের কথা উল্লেখ করে তাদের জয়গান করেছেন, যা আলোচ্য কবিতার কবির চেতনারই সমান্তরাল। সে বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।
