দৃশ্যকল্প-১:
মেঘের উপর মেঘ করেছে, রঙের উপর রঙ
মন্দিরেতে কাঁসর ঘণ্টা বাজল ঠঙ্ ঠঙ্।
ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছ-পালা।
এ পারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিক জ্বালা।
দৃশ্যকল্প-২:
মম যূথীবনে শ্রাবণ মেঘের
সজল পরশ লেগেছে
তৃষ্ণাতুর মন অঙ্গনে যেন
প্রথম বর্ষা নেমেছে।
দিকদিগন্তের পথে অপরূপ আভা দেখা যায়।
"নদীর ফাটলে বন্যা আনে পূর্ণ প্রাণের জোয়ার"- অর্থাৎ বর্ষার প্লাবনে ফসল ফলানোর মাধ্যমে নদীর ফাটলে পূর্ণ প্রাণের জোয়ার আসে।
গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড তাপপ্রবাহে মাঠ-ঘাট শুকিয়ে ফেটে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। এরপর প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসে বর্ষা। এ সময় নদীর দুধারে প্লাবন দেখা দেয়। ফলে পলিমাটির গৌরবে ফসল ভালো হয়। নদীর পলিবাহিত মাটিতে উর্বরতা পুনরায় ফিরে পায় আবাদি জমি। তাই "নদীর ফাটলে বন্যা আনে পূর্ণ প্রাণের জোয়ার।" অর্থাৎ বন্যা নদীকে ও মানুষকে নতুন জীবন দেয়।
দৃশ্যকল্প-১-এর সাথে 'বৃষ্টি' কবিতার সাদৃশ্য রয়েছে বর্ষার আগমনে।
'বৃষ্টি' কবিতায় ফররুখ আহমদ বর্ষার আগমনী চিত্র এঁকেছেন পুবের হাওয়া, কাজল ছায়ায় ঢাকা মাঠ ও বিদগ্ধ আকাশের মাধ্যমে। তিনি বিদ্যুৎকে 'রূপসি পরি'রূপে কল্পনা করেছেন, যে মেঘে মেঘে সওয়ার হয়ে আসে। কবি বর্ষার আগমনের মাধ্যমে প্রকৃতির এক জমজমাট রূপ তুলে ধরেছেন।
দৃশ্যকল্প-১ কবিতাংশে বর্ষার আগমনে প্রকৃতির এক চমৎকার ছবিঅঙ্কিত হয়েছে, যেখানে মেঘের ওপর মেঘ জমে রঙের খেলা সৃষ্টি করেছে। মন্দিরের কাঁসর ঘণ্টার শব্দ বৃষ্টির আগমন ঘোষণা করেছে আর ওপারে ঝাপসা গাছপালার আড়ালে বৃষ্টি নেমেছে। এ পারেতে মেঘের বিদ্যুৎ চমকানিতে আলোর ঝলকানি ঠিকরে পড়ছে। 'বৃষ্টি' কবিতায়ও বর্ষার মাধ্যমে প্রকৃতিতে প্রাণস্পন্দন ফিরে আসার বর্ণনা করা হয়েছে। কবিতায় বিদ্যুৎ রূপসি পরি হয়ে মেঘে মেঘে সওয়ার হয়েছে। বিদগ্ধ মাঠ-ঘাট কাজল ছায়ায় ঢেকে গিয়েছে। বৃষ্টি প্রকৃতিতে সজীবতার জোয়ার এনেছে। 'বৃষ্টি' কবিতা ও দৃশ্যকল্প-১ উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতি এক উৎসবমুখর রূপ পেয়েছে। তাই বলা যায়, দৃশ্যকল্প-১ 'বৃষ্টি' কবিতার প্রকৃতিতে বর্ষা নামার চিত্রের সাদৃশ্য বহন করে।
দৃশ্যকল্প-২-এর ভাব 'বৃষ্টি' কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করেনি, বরং কবিতার তৃষাতপ্ত মন ও বর্ষার পরশের আকাঙ্ক্ষার একটি অংশ ধারণ করেছে।
'বৃষ্টি' কবিতায় প্রকৃতির বর্ণনার, পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর চিত্রায়ণ আছে। বৃষ্টির দিনে সংবেদনশীল মানুষও রসসিক্ত হয়ে ওঠে। তার মনে পড়ে সুখময় অতীত স্মৃতি। বৃষ্টির ছোঁয়ায় যেমন প্রকৃতি স্নিগ্ধতা লাভ করে তেমনই মানুষের মনও পূর্ণতা পায়।
দৃশ্যকল্প-২-এ বর্ষার সজল পরশকে ব্যক্তির মনস্তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রকৃতির স্পর্শকে ব্যক্তির অন্তর্জগতে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। এই বর্ণনা 'বৃষ্টি' কবিতায় বর্ণিত প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানবমনের সম্পর্কের ভাবনার কাছাকাছি হলেও প্রকৃতির ব্যাপক বর্ণনা এতে অনুপস্থিত। এটি কবিতার মানসিক জাগরণের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।
'বৃষ্টি' কবিতাটির সমগ্র ভাবের মধ্যে আছে প্রকৃতির ব্যাপক চিত্রায়ণ, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং বিষণ্ণতার অনুভূতি। কবিতার প্রথম স্তবকটি প্রাণস্পন্দন ও প্রকৃতির উৎসবমুখর রূপ তুলে ধরে যা দৃশ্যকল্প-২-এ নেই। দৃশ্যকল্প-২ তৃষাতুর মন ও বর্ষার সজল পরশের অনুভূতিকে ধারণ করেছে যা 'বৃষ্টি' কবিতার দ্বিতীয় স্তবকের একটি অংশমাত্র। কবিতার দৃষ্টি বিস্মৃত ও সর্বজনীন। তাই বলা যায়, দৃশ্যকল্প-২ কবিতার তৃষাতপ্ত মনের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। সুতরাং দৃশ্যকল্প-২-এর ভাব 'বৃষ্টি' কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করে না।
