অপু জন্মিয়া অবধি কোথাও কখনো যায় নাই। এ গাঁয়েরই বকুলতলা, গোঁসাইবাগান, চালতেতলা, নদীর ধার, বড়ো জোর নবাবগঞ্জ যাইবার পাকা সড়ক- এই পর্যন্ত তাহার দৌড়। মাঝে মাঝে বৈশাখ কি জ্যৈষ্ঠ মাসে খুব গরম পড়িলে বৈকালে দিদির সঙ্গে নদীর ঘাটে গিয়া দাঁড়াইয়া থাকিত। আজ সেই অপু সর্বপ্রথম গ্রামের বাহিরে পা দিল। কয়েকদিন হইতেই উৎসাহে তাহার রাত্রিতে ঘুম হওয়া দায় হইয়া পড়িয়াছিল। দিন গনিতে গনিতে অবশেষে যাইবার দিন আসিয়া গেল।
কবি পাড়ার দস্যি ছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলতে চান।
কবি ফুলের মালা গেঁথে বিভোল পল্লিবালা যে ঘাটে কলস ভরতে যায় সেখানে রেখে আসবেন।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লিপ্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন। তিনি পল্লিগ্রামের গাছের শাখা দুলিয়ে মনের ইচ্ছামতো ফুল পাড়বেন। পল্লিগ্রামের এই বিচিত্র সুন্দর ফুল দিয়ে তিনি মালা গাঁথবেন। সেই গাঁথা মালা তিনি ঘাটে রেখে আসবেন। কবি কল্পনা করেছেন, পল্লিবালা সেই মালা কে রেখে গেছে এটা ভাবতে ভাবতে মালাটি কুড়িয়ে নেবে এবং গলায় পরবে।
পল্লিগ্রামের চিত্র বর্ণনা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার দিক থেকে উদ্দীপক ও 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতা সাদৃশ্যপূর্ণ।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ধরা দিয়েছে। ধানখেত, দিঘির জল, শিমুলডাঙার বন, ডাহুকের ডাক- এসব বর্ণনায় কবি যেন এক জীবন্ত চিত্র অঙ্কন করেছেন। প্রকৃতি এখানে শুধু দৃশ্য নয়, এটি কবির অনুভবের অংশ, জীবনের স্পন্দন।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লিগ্রামে যেতে চেয়েছেন, প্রকৃতি যাকে ঘিরে রেখেছে। তার বনের শীর্ষে আকাশ, পায়ের কাছে দিক-হারা মাঠ, সেখানে বেত-কেয়ার বনে ডাহুক ডাকে। সরু সুতার মতো বাঁকা দীর্ঘ পথে গাঁয়ের মেয়ে কদম-কলি ছড়িয়ে হেঁটে চলে। কবি সেই পথে পল্লি-দুলালের দেশে যাবেন। ধল-দিঘিতে সাঁতার কেটে রক্তকমল তুলে আনবেন। গাছের শাখা দুলিয়ে হাজার রঙের ফুল তুলবেন। সন্ধ্যা নামলে, আঁধার ঘনিয়ে এলে নিরালা নিঝুম অন্ধকারে কবি পল্লি-দুলালের সঙ্গে পল্লিমায়ের অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করবেন। উদ্দীপকের অপু তার গাঁয়ের তেলে-জলেই মানুষ। গাঁয়ের বকুলতলা, গোঁসাইবাগান, চালতেতলা, নদীর ধার এসবই সে দেখে আসছে যা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের উৎস। সে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গরমে বিকেলে নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এই দিক থেকে উদ্দীপক ও কবিতা সাদৃশ্যপূর্ণ।
হ্যাঁ, বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে উদ্দীপকের অপু 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার পল্লি-দুলালের প্রতিনিধিত্ব করে।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপে মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি দেখতে চান সেই আকাশ, মাঠ, বন ও দিঘির জল যেখানে সবকিছু শান্ত ও নির্মল। কবির মনে পল্লি-দুলালের এই দেশ এক আশ্রয়ের প্রতীক, যেখানে মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ মিশে আছে ভালোবাসায়।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লি-দুলাল বলতে পল্লিগ্রামের আদরের ছেলেকে বুঝিয়েছেন, যে পল্লির আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠেছে। কবি তার সাথেই তার পল্লিগ্রামে যেতে চেয়েছেন। সেখানে তিনি পল্লি-দুলালের গ্রামের রূপের সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে গ্রামবাংলার এক অপূর্ব ছবি দেখা যায়। সেই গ্রামকে ঘিরে রেখেছে প্রকৃতি, আর সেই প্রকৃতির ঘিরে রাখা মাঠ, বন এসবেই সে বেড়ে উঠেছে। যেখানে বেত-কেয়ার বনে ডাহুক ডাকে, যেখানে সরু সুতার মতো পথ; সেই পথের রূপ দেখেই বেড়ে উঠেছে পল্লি-দুলাল। উদ্দীপকেও অপুকে দেখা যায় জন্ম অবধি কোথাও যায়নি। গাঁয়ের বকুলতলা, গোঁসাইবাগান, চালতেতলা, নদীর ধার, বড়োজোর নবাবগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছে সে। গ্রামের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচণ্ড গরমে সে দিদির সঙ্গে বিকেলে নদীর ঘাটে হাঁটতে যায়।
উদ্দীপকের 'অপু' পল্লিপ্রকৃতিতে বেড়ে উঠেছে। এমনকি নিজ গ্রামের বাইরে পর্যন্ত যায়নি। তাই সে একজন অকৃত্রিম পল্লি-দুলাল। 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি এমন পল্লিতে বেড়ে ওঠা একজন পল্লি-দুলালের দেশে যেতে চেয়েছেন। তাই বলা যায়, পল্লিতে বেড়ে ওঠা এবং গ্রামের প্রকৃতি চিত্রণের দিক থেকে অপু পল্লি-দুলালের প্রতিনিধিত্ব করে।
