শোন বন্ধু শোন, প্রাণহীন এক শহরের ইতিকথা,
ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায়
দারুণ মর্ম ব্যথা।
এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই
এখানে অন্ধ গলির নরকে মুক্তির আকুলতা!
কবি জসীমউদ্দীন 'পল্লিকবি' নামে খ্যাত।
কবি দূরে ভেসে থাকা মেঘদের মেঘ-কনে বলে সম্বোধন করেছেন।
কবি পল্লি-দুলালের দেশে অর্থাৎ পল্লিগ্রামে যেতে চান। কেননা প্রকৃতিঘেরা পল্লিগ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে। স্টে সৌন্দর্যময় পল্লিপ্রকৃতির রূপ কবি নানা উপমা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাই কবি দূরে ভেসে থাকা মেঘকে মেঘ-কনে হিসেবে সম্বোধন করেছেন। কবির দৃষ্টিতে মেঘ হলো সেই কনেরা যারা মাথায় জলের ঝারি নিয়ে বিজলি পেড়ে শাড়ি, পদ্মর পল্লিগ্রামের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ কবি মেঘকে বিজলি বা বিদ্যুৎ চমকের পাড়যুক্ত শাড়ি পরা কনে হিসেবে কল্পনা করেছেন
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার পল্লিগ্রামের যে অপরূপ সৌন্দর্য বর্ণনা করা হয়েছে তার সঙ্গে উদ্দীপকের শহরের যান্ত্রিক বর্ণনার বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি শিশুসুলভ আনন্দ ও সরলতার প্রতি আকৃষ্ট। দস্যি ছেলেদের সঙ্গে খেলা, দিঘিতে সাঁতার কাটা, শাপলা তোলা- পল্লিজীবনের এসব নির্মল সুখ তাঁকে পল্লিগ্রাম ও প্রকৃতির দিকে টানে।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার বর্ণনায় কবি যেতে চেয়েছেন পল্লি-দুলালের পল্লিগ্রামে। যে পল্লিগ্রামের চারদিক প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। সেখানে বনের শীর্ষে আকাশ, পায়ের কাছে দিক-হারা মাঠ। সেখানে বেত-কেয়ার বনে ডাহুক ডাকে। কবি সেখানের সবু সুতার মতো আঁকাবাঁকা দীর্ঘ পথে হাঁটতে চেয়েছেন। তিনি সেখানে পাড়ার দস্যি ছেলেদের সঙ্গে খেলা করবেন। ধল-দিঘিতে সাঁতার কেটে রক্তকমল তুলে আনবেন। পাখিদের সঙ্গে ডাকবেন। অজানা ফুলের রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। গাছের শাখা দুলিয়ে হাজার রঙের ফুল তুলবেন। চারিদিকে আঁধার নেমে এলে নিরালা নিঝুম অন্ধকারে কবি পল্লির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করবেন। উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই, পল্লির অপূর্ব রূপের বিপরীতে প্রাণহীন এক রূপ, যেখানে ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা। যেখানে পল্লির মতো মুক্ত আকাশ নেই, নেই শ্বাস নেওয়ার মতো স্নিগ্ধ বাতাস। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের সঙ্গে কবিতার বিস্তর বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
পল্লিপ্রকৃতির প্রতি কবির গভীর অনুরাগ বিবেচনায় বলা যায়, "উদ্দীপকের মুক্তির আকুলতাটি কবিকে গ্রামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে" মন্তব্যটি যথার্থ।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতাটি প্রকৃতিপ্রেম, দেশপ্রেম ও শৈশবস্মৃতির এক অনন্য সমন্বয়। কবি যেন নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে যেতে চান- সেই মাটি, সেই জল, সেই গাছপালা যেখানে তাঁর হৃদয় প্রথম গান গেয়েছিল।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় আমরা দেখতে পাই, কবি পল্লি-দুলালের দেশে যেতে চেয়েছেন যা অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশ দিয়ে ঘেরা। কবি এই পল্লিগ্রামের অপরূপ সৌন্দর্যে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। পেয়েছেন প্রাণহীন শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি। গ্রামের ধান-কাউনের খেতের ভেতর দিয়ে সরু সুতার মতো দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথে তিনি হেঁটে যাবেন। পাড়ার দস্যি ছেলেদের সঙ্গে খেলা করবেন, ধল-দিঘিতে সাঁতার কেটে তুলে আনবেন রক্তকমল। পাখিদের সঙ্গে ডাকবেন। এসব বর্ণনা থেকে আমরা দেখতে পাই, কবি প্রকৃতির সঙ্গে কীভাবে মিশে মানবমনের মুক্তির দিশা দিচ্ছেন।
উদ্দীপকেও আমরা দেখতে পাই, এখানে প্রাণহীন এক শহরে ইতিকথা শোনানো হচ্ছে, যার ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যর্থ; যেখানে আকাশ-বাতাস কিছুই নেই। তবে অন্ধ এই গলির নরকে মুক্তির আকুলতা আছে। মূলত নগরযন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভই গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ বাড়ায়, যা আলোচ্য কবিতার কবির মধ্যে দৃশ্যমান। তাই বলা যায়, এই মুক্তির আকুলতাই কবিকে পল্লিগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
