বিপুল সম্ভাবনার পৃথিবী ছেড়ে, / বাঁধা পড়ে গেছ হেশেলের কারাগারে।
মোহময় গিনি, বস্ত্র, অলংকারে / বাঁধা পড়ে গেছে তোমার সোনালি দিন।
'অন্ধবধূ' কবিতায় শ্বশুরকন্যাকে বলা হয়েছে ঠাকুরঝি।
'অন্ধবধূ' কবিতায় 'দরদ-ভরা দুঃখের আলাপন' বলতে কবি সহানুভূতিমিশ্রিত বেদনার বা দুঃখের কথোপকথনকে বুঝিয়েছেন।
কবিতায় 'দরদ-ভরা দুঃখের আলাপন' বলতে বোঝানো হয়েছে সেই কথোপকথন, যেখানে বেদনা ও সহানুভূতি মিশে আছে। বধূটি
অন্ধ হয়ে অসহায় ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করে এবং একলা ঘরের কোণে আবদ্ধ জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। অন্ধবধূ তার হৃদয়ের কষ্ট ও একাকিত্ব দিঘির জলের শীতল পরশের সাথে ভাগ করে নেয়। যেন সে তার মনের ব্যথা প্রকৃতির সঙ্গে ভাগ করে হালকা হতে চায়। এটি একধরনের মানসিক আরামের প্রতীক।
উদ্দীপকের কবিতাংশের সঙ্গে 'অন্ধবধূ' কবিতাটি যে দিক দিয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ তা মূলত বিধিনিষেধ, বন্ধন, বঞ্চনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিহিত।
'অন্ধবধূ' কবিতায় বধূটি মনে করে- ঘরে একা থাকা তার মতো বধূর জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। কেউ তার সঙ্গী হয় না। তাই সে প্রকৃতিকে সঙ্গী বানিয়েছে। নদীর জলে শীতল স্পর্শ তাকে সান্ত্বনা দেয়। মানুষ না শুনলেও প্রকৃতি তার দুঃখ শোনে। এখানে কবি প্রকৃতিকে মানবিক স্নেহের প্রতীক করেছেন।
উদ্দীপকের কবিতাংশে নারীকে 'হেঁশেলের কারাগার'-এ বন্দি দেখানো হয়েছে, যেখানে সে স্বর্ণ, বস্ত্র, অলংকারের মোহে আবন্দ হলেও প্রকৃতপক্ষে সম্ভাবনাময় জীবনের স্বাধীনতা হারিয়েছে। এটা যেন এক সামাজিক বঞ্চনার প্রতিচিত্র। অন্যদিকে 'অন্ধবধূ' কবিতাতেও একজন নারী আছেন, যিনি শারীরিকভাবে অন্ধ এবং সামাজিকভাবে বঞ্চিত। তার জীবনে কষ্ট, একাকিত্ব ও অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। এই নারীর একাকী যন্ত্রণা এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে দিঘির অতল জলে বিলীন হওয়ার ইচ্ছায়। উদ্দীপকের কবিতায় নারী চায় তার সম্ভাবনাময় দিনগুলো ফিরে পেতে, কিন্তু সমাজের নিয়ম তাকে সে সুযোগ দেয়নি। অন্যদিকে 'অন্ধবধূ' কবিতার নারী মুক্তি খোঁজে মৃত্যুর মাধ্যমে। উদ্দীপকের কবিতার নারী সমাজের দ্বারা অবহেলিত; তার সম্ভাবনাময় জীবন বন্ধনগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। 'অন্ধবধূ' কবিতার নারীও একাকী, তার দুঃখ কেউ বোঝে না, এমনকি তার কান্নারও অনুমতি নেই। এভাবে নারীর পরিণতির দিক থেকে উদ্দীপকের সঙ্গে 'অন্ধবধূ' কবিতাটি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উভয় ক্ষেত্রেই বন্দিত্ব, একাকিত্ব, এবং সামাজিক বিধিনিষেধ দিয়ে নারী জীবনের সীমাবদ্ধতাকে চিত্রিত করা হয়েছে বিধায় উদ্দীপকের হেঁশেলের কারাগার এবং 'অন্ধবধূ' কবিতার একলা থাকা সেই তো গৃহকোণ বিষয় দুটি একসূত্রে গাঁথা। কেননা,
'অন্ধবধূ' কবিতায় দুঃখের সবচেয়ে বড় অংশ হলো একাকিত্ব। অন্ধ মানুষকে ঘরে একা থাকতে হয়, কারণ সবাই মনে করে তারা অসুবিধা। ফলে তারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্ধ নারী প্রকৃতিকে আপন করে নেয়, কারণ মানুষের মধ্যে সে আশ্রয় পায় না। এই নিঃসঙ্গতা প্রতিবন্ধী জীবনের নির্মম সত্য।
উদ্দীপকের কবিতাংশে নারীর সম্ভাবনাময় জীবন 'হেঁশেলের কারাগারে' আবদ্ধ হয়ে যায়। বস্ত্র, অলংকারের মোহময় জগৎ তাকে সংসারের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে। তার সোনালি দিনগুলো হারিয়ে যায়। সমাজ তাকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে দেয় না, বরং গৃহস্থালির কাজে আটকে রাখে। অন্যদিকে 'অন্ধবধূ' কবিতাটিতেও 'একলা থাকা সেই গৃহকোণ' এক নারীর নিঃসঙ্গতা, শূন্যতা ও পরাধীনতার প্রতীক। প্রবাসী স্বামী বা পরিবারের নির্ভরশীলতা তাকে একাকিত্বের গভীরে ঠেলে দেয়। সে ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং অবশেষে 'শ্যাওলা-দীঘির শীতল অতল নীরে' আত্মনিবেদন করে মুক্তি খোঁজে।
উদ্দীপক এবং 'অন্ধবধূ' কবিতা উভয় ক্ষেত্রেই নারীর সামাজিক অবস্থানকে ফুটিয়ে তোলে- একটিতে নারী সংসারের কাজে আবন্ধ, অন্যটিতে সে একাকিত্বে জর্জরিত। উদ্দীপকের কবিতার নারীকে জীবনের বাস্তবতা বন্দি করে রাখে এবং 'অন্ধবধূ' কবিতার নারী সেই একাকিত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে তার বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও ফিকে হয়ে আসে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের 'হেঁশেলের কারাগার' এবং 'অন্ধবধূ' কবিতার 'একলা-থাকা-সেই তো গৃহকোণ' বিষয় দুটি একসূত্রে গাঁথা।
