মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। জীবনের এই স্বল্প সময়ের সমগ্র হিসাব চুকিয়ে, সব সম্পর্ক ছিন্ন করে পরপারে চলে যেতে হয়। গৃহবধূ সুদীপা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলেন, ‘সুন্দর এই পৃথিবী, ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধ্যা, জোছনাভরা রাত সব ছেড়ে আমাদের বিদায় নিতে হবে।’
'মধুমদির বাসে' কথাটির অর্থ মধুর গন্ধে মোহময় সুগন্ধে আচ্ছন্ন।
'কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে' পঙ্ক্তিটি দ্বারা প্রকৃতির বসন্ত ঋতুর শেষ হয়ে আসা এবং জ্যৈষ্ঠ আসার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
'অন্ধবধূ' কবিতায় কবি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অনুভবের অসাধারণ জগৎকে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতির বিচিত্র রঙের ধারণা ও অনুভবে সে সমৃদ্ধ। কোকিলের ডাকে ঋতু পরিবর্তনের বিষয়টি সে অনুভব করতে পারে। পায়ের তলায় নরম বস্তু যে ঝরা-বকুল সেটি বুঝতে তার অসুবিধা হয় না। সে জ্যৈষ্ঠ আসার দিন অনুমান করতে পারে। মূলত অন্ধ হলেও সে প্রকৃতির কাছে মনের দৃষ্টি মেলে বসে থাকে, আর সেই বসে থাকার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির পরিবর্তন অনুভব করতে চায়।
উদ্দীপকের বক্তব্য 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার দিকটিকে আলোকপাত করেছে।
অন্ধবধূ নিজেকে দুর্ভাগা মনে করলেও প্রকৃতির স্নেহে সে বাঁচে। জলের শীতলতা, বকুলফুলের নরম স্পর্শ, বাতাসের ছোঁয়া- সবই তাকে জীবনের সৌন্দর্য শেখায়। দৃষ্টিহীনতার মধ্যেও সে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে প্রকৃতির মধ্যেই জীবনের আলো খুঁজে পায়।
উদ্দীপকে গৃহবধূ সুদীপার প্রকৃতির প্রতি অনুরাগের দিকটি ফুটে উঠেছে। সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে তার চলে যেতে ইচ্ছে করে না। সন্ধ্যার ঝিঝি ডাক, জোছনাভরা রাত তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। মৃত্যুর মাধ্যমে সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে সে দুঃখ প্রকাশ করে। বস্তুত উদ্দীপকের প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ও অন্তরঙ্গতা ফুটে উঠেছে। 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূ উদ্দীপকের গৃহবধূ সুদীপার মতোই প্রকৃতির প্রতি গভীর টান অনুভব করে। এই কারণে সে প্রকৃতির সান্নিধ্য ছেড়ে ঘরের কোণে যেতে চায় না। প্রকৃতির স্নিগ্ধ-শীতল জল দেখতে দেখতে সে প্রাণের কথা বলতে চায়। জীবনের সুখ-দুঃখের আলাপ করতে চায়। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সে মনের ব্যথা ভুলে যায়, যা উদ্দীপকের গৃহবধূ সুদীপার প্রকৃতির সঙ্গে অন্তরঙ্গতার দিকটি অনুরূপ।
কবিতার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের মনোবেদনা ও ইন্দ্রিয়চেতনার দিকটি উদ্দীপকে প্রতিফলিত না হওয়ায় "উদ্দীপকের বক্তব্যে 'অন্ধবধূ' কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি"- মন্তব্যটি যথার্থ।
'অন্ধবধূ' কবিতায় কবি একজন অন্ধ নারীর হৃদয়ের আবেগ, ব্যথা ও মানসিক শক্তির চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি চারপাশ অনুভব করেন স্পর্শে, সুগন্ধে, বাতাসে। পায়ের নিচে নরম বকুলফুল পড়ে থাকলে সে বুঝতে পারে গন্ধ ও স্পর্শে। তার দৃষ্টি নেই, কিন্তু অনুভূতির চোখে সে প্রকৃতিকে দেখে। এই প্রকৃতি-অনুভূতিই তাকে জীবনের কঠিন বাস্তবতাও সহজ করে দেয়।
উদ্দীপকে গৃহবধূ সুদীপার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি অনুরাগের দিকটি ফুটে উঠেছে। সে মৃত্যুর কথা ভেবে দুঃখ প্রকাশ করে। সে এ সুন্দর পৃথিবী, ঝিঁ ঝিঁ ডাকা সন্ধ্যা, জোছনাভরা রাত ইত্যাদি ছেড়ে বিদায় নিতে চায় না। এ দিকটি 'অন্ধবধূ' কবিতার শুধু অন্ধবধূর প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের দিকটিকে নির্দেশ করে। এ কবিতার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের মনোবেদনা, তাদের অন্তর্দৃষ্টি, তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ইত্যাদি দিক উদ্দীপকে নেই।
'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূর অন্তর্দৃষ্টিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা প্রকৃতির সাথে আলোচ্য উদ্দীপকের মিল সামান্যই। 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর প্রতি পরিবার-পরিজন ও সমাজের অবজ্ঞা এবং অন্ধবধূর একলা থাকা গৃহকোণে ফিরে যাওয়ার তাড়া অনুভব না করাও উদ্দীপকের গৃহবধূ সুদীপার মধ্যে নেই। এসব কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, উদ্দীপকের বক্তব্যে 'অন্ধবধূ' কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি।
