বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি পল্লিমায়ের কোল;
ঝাউশাখে যেথা বনলতা বাঁধি হরষে খেয়েছি দোল;
কুলের কাঁটার আঘাত সহিয়া কাঁচাপাকা কুল খেয়ে
অমৃতের স্বাদ যেন লভিয়াছি গাঁয়ের দুলালি মেয়ে।
‘জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে’ বলতে কবি আশার ছলনায় নিজের মনকে তৃপ্ত করার কথা বুঝিয়েছেন।
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবি সুনাম অর্জনের আশায় নিজ দেশ ও দেশের সংস্কৃতি পরিত্যাগ করে সুদূর ফ্রান্সে চলে গিয়েছেন। প্রবাসজীবনে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ অনুভূত হয়। এ সময় তিনি কপোতাক্ষ নদের প্রতি স্মৃতিকাতর হয়ে ব্যাকুল পড়েন। অনুভূতির গভীরে কপোতাক্ষকে স্থান দেন বলে কবির মনে হয় তিনি যেন সে নদীর কলধ্বনি শুনছেন। প্রশ্নোক্ত উক্তির মাধ্যমে কবি নিজের আত্মতৃপ্তির বিষয়টিকেই বুঝিয়েছেন।
উদ্দীপকের প্রথমাংশের সাথে ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবির শৈশবের স্মৃতিকাতরতার দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্যাতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে প্রবাসী হলেও শৈশবের স্মৃতিঘেরা কপোতাক্ষ নদকে ভুলে থাকতে পারেননি। এ নদ কবিকে অনন্য ভালোবাসায় সিক্ত করেছে, মায়ের স্নেহডোরে বেঁধে তাঁর শৈশবস্নৃতি জাগ্রত করেছে। তাইতো ভালোবাসা প্রত্যাশী কবি এই নদের স্নেহধারায় মিশে ফিরে আসতে চান তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে।
উদ্দীপকের কবিতাংশে কবির স্মৃতিকাতরতার মাধ্যমে আবহমান গ্রামবাংলার রূপ চিত্রিত হয়েছে। ঝাউগাছ, বনলতা, ঝাউয়ের শাখে বনলতা বেঁধে দোল খাওয়া প্রভৃতি বর্ণিত হয়েছে। উদ্দীপকের কবি যেমন তাঁর গ্রামীণ আবহে কাটানো শৈশবের স্মৃতিকাতর তেমনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত পরভূমে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের প্রথমাংশে বিধৃত কবিতাংশটি ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার স্মৃতিকাতরতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
"উদ্দীপক ও 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতার মূলসুর অভিন্ন।"-মন্তব্যটি পল্লি-প্রকৃতি ও জন্মভূমিপ্রীতির দিক থেকে যথার্থ।
'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় কবির স্মৃতিকাতরতার আবরণে তার অত্যুজ্জ্বল দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। শৈশবে কবি তার জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। ফ্রান্সে বসবাসকালে এই স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি। দূর দেশে বসেও তিনি যেন স্বদেশের কপোতাক্ষ নদের কলকল ধ্বনি শুনতে পান। অনেক নদী দেখেছেন, কিন্তু জন্মভূমির এই নদের মতো স্নেহাদর আর কোথাও পাননি, তাকে আর কোনো নদীই এতো মোহনীয় পরশ দিতে পারেনি।
উদ্দীপকেও পল্লিপ্রকৃতি ও স্বদেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। উদ্দীপকে বর্ণিত কবির শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে, মনে পড়ে পল্লিজননীর স্নেহময় কোলের কথা। যেখানে ঝাউবনের শাখা আর বনলতা একত্রে দোল খায়। মনে পড়ে কুল খেতে গিয়ে কাঁটার আঘাত পাওয়ার কথা।
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উদ্দীপকের সৌহার্দপূর্ণ স্নেহমায়াময় গ্রাম এবং 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতায় বর্ণিত স্নেহপূর্ণ গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নদীকেন্দ্রিক স্মৃতি স্বদেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকে যে ভাবটি প্রতিফলিত হয়েছে তা যেন 'কপোতাক্ষ নদ' কবিতারই মূলসুর।
