উদ্দীপক-১ : আমার যেতে ইচ্ছে করে
নদীটির ওই পারে
যেথায় ধারে ধারে
বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকা
বাঁধা সারে সারে।
উদ্দীপক-২ : ওগো আমার জন্মভূমি, ওগো অপরূপা
ফিরে কী আর পাবো তোমায়?
এ বিদেশ, বিভূঁয়ে তোমারে স্মরি আনমনে
আঁখি মুছি সযতনে
তবু আশা পারি না ছাড়িতে,
বেঁধে রেখেছো যে মা, তোমার স্নেহডোরে।
‘জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে’ বলতে কবি আশার ছলনায় নিজের মনকে তৃপ্ত করার কথা বুঝিয়েছেন।
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবি খ্যাতি লাভের আশায় নিজ দেশ ও দেশের সংস্কৃতিকে ত্যাগ করে সুদুর ফ্রান্সে চলে গিয়েছিলেন। প্রবাসজীবনে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। এ সময় তিনি কপোতাক্ষ নদের প্রতি সৃতিকাতর হয়ে পড়েন। অনুভূতির গভীরে কপোতাক্ষকে স্থান দেন বলে কবির মনে হয় তিনি যেন সে নদীর কলধ্বনি শুনছেন। প্রশ্নোক্ত উক্তির মাধ্যমে কবি নিজেকে আত্মতৃপ্তির বিষয়টিকেই বুঝিয়েছেন।
উদ্দীপক-১ এর সঙ্গে ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় প্রকাশিত কবির প্রিয় কপোতাক্ষের দেখা পাওয়ার আকুলতার দিকটির সাদৃশ্য রয়েছে।
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় শৈশবের স্মৃতিবিজরিত কপোতাক্ষ নদকে ঘিরে কবি তাঁর গভীর হৃদয়াবেগ প্রকাশ করেছেন। বিদেশি সাহিত্য-সংস্কৃতির টানে কবি প্রবাসী হলেও ক্ষণিকের জন্যও তিনি প্রিয় কপোতাক্ষকে ভুলতে পারেননি। আর তাই বিদেশ-বিভুইয়ে বসেও কপোতাক্ষের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য আকুল হয়েছেন তিনি। কবিতাটির পুরোভাগ জুড়ে কবির সেই আকুলতাই প্রকাশ পেয়েছে।
উদ্দীপক- ১ এর কবিতাংশে কবিমনের কৌতূহল ও সুপ্ত বাসনার কথা ফুটে উঠেছে। যেখানে নদীর ওপারের সারিবদ্ধ নৌকা এবং এর রহস্যময় সৌন্দর্য কবিকে মুগ্ধ করে। কবি তাই সেই সৌন্দর্যের খোঁজে নদীর ওপারে যেতে চান। অন্যদিকে, ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবি প্রবাসী। কিন্তু প্রবাসে অবস্থান করেও তিনি শৈশবের স্মৃতিময় কপোতাক্ষ নদকে বিস্নৃত হতে পারেননি। এ নদের কলধ্বনি সর্বদাই যেন তাঁর কানে বাজে। আর তাই যে করেই হোক সখারূপী প্রিয় কপোতাক্ষের দেখা পেতে তিনি ব্যাকুল, যেমনটি নদীর ওপারকে কেন্দ্র করে উদ্দীপক-১ এর কবিতাংশেও লক্ষ করা যায়। এদিক থেকে উদ্দীপক-১ এর সঙ্গে ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার সাদৃশ্য প্রতীয়মান হয়।
"উদ্দীপক-২ এবং ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবির মনোভাব একইসূত্রে গাঁথা।"- মন্তব্যটি যথার্থ বলেই আমি মনে করি।
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার স্বদেশের প্রিয় নদ কপোতাক্ষকে ঘিরে স্মৃতিকাতার আড়ালে কবির অত্যুজ্বল দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। বিদেশি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির টানে এক সময় কবি সুদূর ফ্রান্সে পাড়ি জমান। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই কবির মোহভঙ্গ হয়। অনুশোচনাদগ্ধ কবি তখন মাতৃভূমির স্নেহস্পর্শ পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। আলোচ্য কবিতায় কপোতাক্ষকে ঘিরে কবির সেই ব্যাকুলতাই বাণীরূপ লাভ করেছে।
উদ্দীপক-২ এর কবিতাংশে মাতৃভূমির প্রতি কবি হৃদয়ের গভীর ভাবাবেগ ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা যায়, বিদেশ-বিভূঁয়ে অবস্থান করেও তিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিকে কিছুতেই ভুলতে পারেননি। হৃদয়ের মনিকোঠায় তাই মাতৃভূমিকে তিনি সযতনে রেখেছেন। তা সত্ত্বেও ক্ষণে ক্ষণে দেশমাতৃকার কথা মনে করে তিনি আপ্লুত হয়ে পড়েন, তার স্নেহস্পর্শ পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। কেননা, মাতৃভূমি তাঁকে যে স্নেহবন্ধনে আবদ্ধ করেছে তা কখনো ছিন্ন হওয়ার নয়।
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবি তাঁর মাতৃভূমিকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন। আর সে ভালোবাসা থেকেই তিনি কপোতাক্ষকে আশ্রয় করে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা বঙ্গবাসীর কানে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রবাসে অবস্থান করেও কপোতাক্ষ নদের প্রতি তাঁর যে অনুরাগ, তা মূলত কবির দেশাত্ববোধেরই নামান্তর। একইভাবে, উদ্দীপক-২ এর কবিতাংশের কবিও মাতৃভূমির স্নেহডোরে আবদ্ধ। আর তাই বিদেশ-বিভূঁয়ে থেকেও তিনি মাতৃভূমির স্নেহস্পর্শ পেতে এতটা ব্যাকুল, যা ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতার কবির মনোভাবেরই সমান্তরাল। সেদিক বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ অর্থবহ।
