একমাত্র সন্তান কাব্য বাক্প্রতিবন্ধী- বিষয়টি যখন জানলেন মিসেস শরীফা- একটুও ঘাবড়ালেন না; স্বামীকেও বোঝালেন। বাবা-মা’র পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্নে বেড়ে উঠতে লাগল কাব্য। একদিন মা লক্ষ করলেন ছেলে আপন মনে কাগজে আঁকিবুকি করছে। তিনি বুঝে গেলেন মুখে ভাষা না থাকলেও তুলির আঁচড়েই সে একদিন বিশ্ব জয় করবে। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ছেলের আঁকাআঁকির জন্য যা যা করা দরকার সব করলেন। আজ দেশে-বিদেশে কাব্যে’র আঁকা ছবি প্রদর্শনী হচ্ছে; বিক্রি হচ্ছে বহু মূল্যে।
বাবা-মায়ের বিদেশযাত্রার আয়োজন দেখে সুভার হৃদয় অশ্রু-বাষ্পে ভরে উঠেছিল।
নিজের চিরচেনা জগৎকে আঁকড়ে ধরে সুভা প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছে।
বাক্প্রতিবন্ধী সুভাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পিতা তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার আয়োজন করেন। কলকাতায় যাওয়ার আগের দিন সুভা তার চিরপরিচিত জগৎ নদীতীরে এসে লুটিয়ে পড়ে। দুই বাহু প্রসারিত করে সে যেন ধরণিকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কারণ সে তার এই চিরচেনা প্রকৃতি ও পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। সে চায় ধরণিও তাকে যেন জড়িয়ে ধরে রাখে। তাকে যেন যেতে না দেয়। প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মধ্য দিয়ে সুভার এই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে।
কাব্যের বাবা-মায়ের সঙ্গে 'সুভা' গল্পের বাবা-মা'র বৈসাদৃশ্য রয়েছে প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে।
'সুভা' গল্পের সুভা বাবা-মায়ের নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করত। পিতা-মাতার মনে সে বেদনার মতো সর্বদা জাগরূক ছিল। মা সুভাকে তার গর্ভের কলঙ্ক মনে করতেন।
উদ্দীপকের কাব্য বাক্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তার মা মিসেস শরীফা একটুও ঘাবড়ালেন না; স্বামীকেও বোঝালেন। বাবা-মায়ের পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্নে বেড়ে উঠতে লাগল কাব্য। অন্যদিকে 'সুভা' গল্পে বাবা তাকে কিছুটা ভালোবাসলেও মা সুভাকে নিজের ত্রুটি হিসেবে দেখেন; তাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক বিবেচনা করে তার প্রতি খুবই বিরক্ত হন। বয়স বাড়তে শুরু করলে মা-বাবা তাকে বোঝা হিসেবে মনে করেন। লোকের নিন্দা থেকে বাঁচার জন্য পিতা সুভাকে নিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এভাবে কাব্য'র বাবা-মা'র সঙ্গে 'সুভা' গল্পের বাবা-মায়ের প্রতিবন্ধী সন্তানের প্রতি তাদের আচরণ ও মনোভাবে বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়।
অনুকূল পরিবেশের অভাবে সুভার যথাযথ বিকাশ হয়নি বিধায় "উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে কাব্যের মতো সুভা সমাজের একজন হয়ে উঠতে পারত" মন্তব্যটি যথার্থ।
'সুভা' গল্পের সুভা ছিল বাক্প্রতিবন্ধী। তাই পিতা-মাতার হৃদয়ভার ছিল সে। সবার কথা শুনে সে নিজেকে বিধাতার অভিশাপ ভেবে আত্মগোপন করতে চাইত। তার মা তাকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখতেন, গর্ভের কলঙ্ক ভেবে বিরক্ত হতেন। কেউ তার সঙ্গে মিশত না, খেলা করত না। এমন প্রতিকূল পরিবেশে তার স্বাভাবিক বিকাশ হয়নি।
উদ্দীপকের কাব্য একজন বাক্প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মায়ের কাছ থেকে পরম স্নেহ-মমতা ও আদর-যত্ন পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে। কাগজে তার আঁকিবুকি দেখে মা তাকে নিয়ে আশান্বিত হন। তিনি বুঝে যান- মুখে ভাষা না থাকলেও তুলির আঁচড়েই সে একদিন বিশ্ব জয় করবে। স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে ছেলের আঁকাআঁকির জন্য যা যা করা দরকার সব করলেন। ফলে সে তার প্রতিভা সবাইকে দেখিয়ে দেয়। দেশে-বিদেশে প্রদর্শনী হয় তার ছবির, বহু মূল্যে বিক্রি হয়।'সুভা' গল্পে সুভা একজন বাক্প্রতিবন্ধী। তবে সে তার চারপাশের সবকিছুই উপলব্ধি করতে পারে। বাক্প্রতিবন্ধী সুভা মা, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের মানসিক সহায়তা বা সহানুভূতি পায়নি। অথচ সে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছে। প্রতাপের কথায় সে কষ্টও পেয়েছে। বাবা তাকে নিয়ে কলকাতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে সে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছে। গোয়ালের গাভি দুটোকে সে নিজের বেদনার সঙ্গী করেছে। পরিবার, সমাজ থেকে সে শুধু কষ্টই পেয়েছে, কোনো অনুপ্রেরণা পায়নি। পরিবার ও সমাজ থেকে উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে কাব্যের মতো সুভাও সমাজের একজন হয়ে উঠতে পারত। কেননা সব বোধ অনুভূতি তার পরিপূর্ণ ছিল। এ দিক থেকে মন্তব্যটি যথার্থ।
