করতোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি অন্যান্য জীবনমুখী বই-পুস্তক পড়ার প্রতি উৎসাহিত করেন। তিনি আরও বলেন, সাহিত্য মানুষের মনকে সুন্দর করে, আলোকিত করে। আর সুন্দর মনের মানুষেরা জ্ঞানী হয়। ফাহিম তার মায়ের কাছে শিক্ষকের উপদেশবাণীর কথা বললে, মা ধমক দিয়ে বলেন, আগে পরীক্ষার Result, তারপর অন্য কিছু। ওসব সাহিত্যচর্চা, বই-পুস্তক পড়া- বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না।
প্রমথ চৌধুরীর মতে, বই পড়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অর্থ জাতির জীবনীশক্তির হ্রাস করা।
'সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত' বলতে বোঝানো হয়েছে, যে-শিক্ষা নিজে স্বচ্ছন্দচিত্তে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জন করে।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে ভেতর থেকে মানুষ করে তোলা। যে মানুষ স্কুল-কলেজের শিক্ষাই শুধু নয়, নিজ অনুসন্ধিৎসা ও আগ্রহে জ্ঞানের নানা বিষয়ে অবগাহন করেছেন তিনি সুশিক্ষিত। এই শিক্ষা নিজে নিজে অর্জন করতে হয়। শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না। শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীকে পথ দেখাতে পারেন, শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্ব অর্জন করে সমাজের কল্যাণ সাধন করে থাকেন। এ কারণেই সুশিক্ষিত লোককেই লেখক স্বশিক্ষিত বলেছেন।
উদ্দীপকের ফাহিমের মায়ের শিক্ষার ফললাভের দিকটি 'বই পড়া' প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন যে, বর্তমান সমাজের অধিকাংশ লোকই শিক্ষার বস্তুগত চাহিদা পূরণে লালায়িত। তারা প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে না জেনে অর্থ উপার্জনকেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মনে করে। বর্তমানে স্কুল-কলেজে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাও একেই সমর্থন করে। যা লেখকের প্রত্যাশার বিপরীত। কারণ শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেটের জন্য নোট মুখস্থ করে পরীক্ষা দিলেও শিক্ষার পূর্ণতার জন্য পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোনো বই পড়তে চায় না। নগদ বাজারদর না থাকায় সাহিত্যচর্চাতেও তাদের অনীহা প্রকাশ করে।
উদ্দীপকের ফাহিম দশম শ্রেণির ছাত্রী। তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য জীবনমুখী বই পড়তে উৎসাহিত করেন। প্রধান শিক্ষকের এ উপদেশবাণী ফাহিমের মা শুনে ফাহিমকে ধমক দেন এবং শুধু পাঠ্যবই পড়ে ভালো ফলাফল অর্জন করতে বলেন। ফাহিমের মায়ের এ আচরণে 'বই পড়া' প্রবন্ধে প্রতিফলিত শিক্ষার ফললাভ বা নগদ বাজারদরের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। প্রবন্ধে বলা হয়েছে- আমরা সব সময় শিক্ষার ফল লাভের জন্য উদ্বাহু। আমরা বিশ্বাস করি শিক্ষা আমাদের গায়ের জ্বালা ও চোখের জল দূর করবে। আমরা সাহিত্যের রস উপভোগ করতে প্রস্তুত নই যা ফাহিমের মায়ের আচরণেও প্রকাশ পেয়েছে। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকের ফাহিমের মায়ের শিক্ষার ফললাভের দিকটি আলোচ্য প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক সুশিক্ষিত হওয়ার জন্য পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করার পক্ষে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় “উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষক যেন 'বই পড়া' প্রবন্ধের লেখকের স্বার্থক প্রতিনিধি” মন্তব্যটি যথার্থ।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক পাঠে অনীহার কারণ হিসেবে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে আমাদের হৃদয়বৃত্তিকে প্রস্ফুটিত না করে তা নষ্ট করে দেয় সেই দিকটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজে জোর করে বিদ্যা গেলানো হয় এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হয় এবং তাদের আত্মার মৃত্যু ঘটে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক শিক্ষার ত্রুটি ও হীন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য, স্বশিক্ষা অর্জনের জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং বই পড়ার প্রতি বিশেষ জোর দিয়েছেন। যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। লেখকের এই দিকটি উদ্দীপকের প্রতিভা করতোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চিন্তাধারায় প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের জন্য মতবিনিময় সভায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি অন্যান্য জীবনমুখী বই-পুস্তক পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন সাহিত্য মানুষের মন সুন্দর করে। আর সুন্দর মনের মানুষেরা জ্ঞানী হয়।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক যথার্থ শিক্ষিত হয়ে মনের প্রসার ঘটানোর জন্য বই পড়তে বলেছেন। এ কারণে তিনি লাইব্রেরিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ মানুষ সেখানে গিয়ে পছন্দমতো বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করে। লেখক মানসিক বিকাশ ও জ্ঞানলাভের জন্য বই পড়তে উৎসাহিত করেছেন। লেখকের সেই পরামর্শের সঙ্গে উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শ একসূত্রে গাঁথা। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য ভালো বই পড়ে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছেন। এসব দিক বিচারে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
