(i) “দেখিনু সেদিন রেলে-
কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলে নিচে ফেলে”
(ii) “কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাখি? হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিয়েছেন দিবা-রাতি। অথবা হয়তো কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে, আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,”
মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের বড় ছেলে বলেছেন- "সব ব্যাটারাই এখন বামুন কায়েত হতে চায়"।
কাঙালীর মায়ের শারীরিক অবস্থার জন্য নাপিত কাঙালীর মায়ের হাত দেখে মুখ গম্ভীর করে।
কাঙালীর মা বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ ছিল। নীচ জাত এবং দরিদ্র হওয়ার কারণে কবিরাজ তাকে বাড়িতে দেখতেও আসেনি, ভালো ওষুধও দেয়নি। আর যে ওষুধ অনেক কষ্টে জোগাড় করা হয়, কাঙালীর মা তা না খেয়ে উনুনে ফেলে দেয়। অবস্থা বেশি খারাপ হলে ঈশ্বর নাপিত এসে নাড়ি পরীক্ষা করে। হাত দেখে সে বুঝতে পারে, কাঙালীর মা মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যাওয়ার উপক্রম। কাঙালীর মায়ের শরীরের ভয়ানক অবস্থা বুঝতে পেরে ঈশ্বর নাপিত মুখ গম্ভীর।
উদ্ধৃতি (ⅰ)-এ 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের শ্রেণিবৈষম্যের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
পৃথিবীতে সব মানুষ সমান পরিস্থিতিতে থাকে না। কেউ ধনী, কেউ গরিব, কেউ উঁচু জাত, কেউ নীচ জাত। এই বিভেদ-বৈষম্যের জন্য সমাজব্যবস্থা দায়ী। কিন্তু, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও বৈষম্য তৈরি করেছি আমরা নিজেরা। কিন্তু, পৃথিবীতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না থাকলে পৃথিবীটা আরও শান্তিপূর্ণ এবং বাসের উপযোগী হয়ে উঠবে।
উদ্ধৃতি (i)-এ দেখা গেছে কুলি বলে জনৈক ব্যক্তিকে এক বাবু সাহেব ঠেলে নিচে ফেলে দেয়। শুধু সে গরিব এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল বলে তাকে ঠেলে নিচে ফেলে দিয়েছে। অন্যদিকে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে অভাগীর মৃত্যুর পরে তাকে পোড়ানোর জন্য তার ছেলে কাঙালী অনেক চেষ্টা করেও কাঠ জোগাড় করতে পারেনি। কারণ তারা নীচ শ্রেণির মানুষ, জাতে তারা দুলে। অনেক অনুনয়-বিনয় করলেও এক টুকরো কাঠ কেউ দেয়নি অভাগীকে পোড়ানোর জন্য। এমনকি অভাগীর নিজে হাতে লাগানো গাছ নিতে চাইলে তাও দেয়নি। অভাগীর খুব ইচ্ছে ছিল মারা যাওয়ার পরে যেন আগুন দিয়ে তার মৃতদেহের সৎকার করা হয়। শুধু নীচ শ্রেণির বলে অভাগীর মৃতদেহ পোড়ানোর কাঠ কাঙালী জোগাড় করতে পারে না। উদ্ধৃতি (i)-এ যেন 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের শ্রেণিবৈষম্য ফুটে উঠেছে। এই ভাবেই গল্পের মানুষে মানুষে শ্রেণি ভেদাভেদের দিকটি উদ্ধৃতিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্ধৃতি (ii)-এর কবি এবং 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের লেখক উভয়ের মধ্যে সমাজের দরিদ্র ও নিচু শ্রেণির মানুষের প্রতি সহমর্মিতা লক্ষণীয়- উক্তিটি সার্থক।
সমাজের সবচেয়ে সংগ্রামী মানুষ হলো আমাদের চারপাশের নিম্নশ্রেণির মানুষেরা। তারা অনেক পরিশ্রম করলেও সমাজে তারাই সবচেয়ে অবহেলিত। সমাজ তাদেরকে শোষণ করেই এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে।
উদ্ধৃতি (ii)-এ কবি বলেছেন, আমরা সমার্জের নিচু স্তরের মানুষদের অবহেলা করি। কিন্তু তাদের ভেতরেও ঈশ্বর থাকতে পারে। আর তাদের ভেতরে যদি ঈশ্বর নাও থাকে তাহলেও তাদেরকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, তাদের জীবন সংগ্রামী এবং দুঃখ-
কষ্টে জর্জরিত। সমাজের উচ্চ অবস্থানে থাকা লোকজন কখনই তাদের দঃখের কথা জানার চেষ্টা করে না, বরং তাদেরকে আরও কষ্ট দেয়। 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পেও দেখা যায় অভাগী অনেক কষ্টে বিয়ের পরে ছেলেকে মানুষ করেছে। তাদের অভাবের শেষ নেই। এমনকি মারা যাওয়ার পর তার সৎকার করার জন্য সামান্য কাঠও কেউ দেয়নি। কারণ অভাগী গরিব, তার ছেলে ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে লেখক নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রতি সামাজিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।
উদ্ধৃতি (ii)-এ কবি দরিদ্র ও নীচ শ্রেণির মানুষের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করেছেন। কবিতার লাইনগুলো থেকে বোঝা যায় কবি অবহেলিত মানুষের প্রতি সমৃদয় ব্যক্তি। একই বিষয় ফুটে উঠেছে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে। অভাগীর দুঃখ-কষ্টের বর্ণনা এবং শেষ পর্যন্ত তার সৎকারের জন্য কাঠ না পাওয়া যাওয়ায় যে করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয় তা আমাদের হৃদয়ে এক আর্দ্র অনুভূতির সৃষ্টি করে। তাদের প্রতি আমরা সহমর্মিতা অনুভব করি যা প্রকাশ করাই লেখকের উদ্দেশ্য। তাই বলা যায়, উদ্ধৃতি (ii)-এর কবি এবং 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের লেখক দুজনই দরিদ্র এবং নীচ শ্রেণির মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন।
