রহিম চৌধুরী কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েও সাধারণ জীবনযাপনে অভান্ত। কিছুদিন পূর্বে তাঁর বড় মেয়ের বিয়েতে এলাকার সকলকে দাওয়াত দেন। তিনি ধনী-গরিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। তাঁর এ আচরণে এলাকার দরিদ্র জনগণ খুবই সন্তুষ্ট।
ঠাকুরদাস মুখুয্যের স্ত্রী সাত দিনের অসুখে মারা গেলেন।
স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য পালন না করা এবং স্ত্রীর কাছে নিজের অবস্থান উপলব্ধি করতে পেরে রসিক দুলে তার পায়ের ধুলো দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলল।
রসিক দুলে অভাগীর স্বামী। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি কোনো কর্তব্যই সে পালন করেনি। একমাত্র ছেলে কাঙালী জন্ম নেওয়ার পর সে অভাগীকে ত্যাগ করে আরও একটা বিয়ে করে অন্য গ্রামে চলে যায়। এদিকে অভাগী অভাব-অনটনের মধ্যে ছেলেকে বুকে নিয়ে দিন কাটায়। প্রায় বিনা চিকিৎসায় আজ সে মৃত্যুপথযাত্রী। অভাগী মৃত্যুর আগে স্বামীর পায়ের ধুলো নিতে চাইলে কাঙালী গিয়ে তাকে ডেকে আনে। তখন রসিক দুলে অভাগীকে পায়ের ধূলো দিতে গিয়ে নিজের কৃতকর্ম এবং তার প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ দেখে কেঁদে ফেলে।
মানবিক ও শ্রেণি-বৈষম্যহীন চেতনার দিক থেকে উদ্দীপকের সঙ্গে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
মানুষ মানুষেরই জন্য, জীবন জীবনেরই জন্য। কিন্তু মানবিকতার এই মূলমন্ত্র আমাদের সমাজ সভ্যতায় খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। অনেকে আছে নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে রাখে। আবার অনেকে মানুষের মধ্যকার কোনো ভেদাভেদ স্বীকার করেন না।
উদ্দীপকে মানবিকতার উজ্জ্বল নিদর্শন দেখা যায় রহিম চৌধুরীর মাঝে। তিনি অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়েও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যন্ত। নিজের মেয়ের বিয়েতে তিনি এলাকার আপামর জনসাধারণকে নিমন্ত্রণ করেন। সেখানে জাতভেদ বা শ্রেণিভেদ কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। এ চেতনাটি 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের উপস্থাপিত জাত-পাতের ভেদাভেদের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। আলোচ্য গল্পে বর্ণিত হয়েছে তৎকালীন হিন্দু সমাজে বর্ণ-বৈষম্য, তথাকথিত নীচ বর্ণের মানুষদের উপর জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার ইত্যাদি। এই জাতপ্রথার বলি হয়েই কাঙালীর মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি। মায়ের মুখাগ্নি করার জন্য নিজের বাড়ির আঙ্গিনার গাছ কাটারও অনুমতি পায়নি ব্রাহ্মণ জমিদারের কাছ থেকে। সমাজের এই বর্ণভেদ, শ্রেণিভেদ চেতনার 'সাথে উদ্দীপকটি বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
"অভাগীর আশা পূর্ণতা পাওয়ার জন্য রহিম চৌধুরীদের মতো মানুষ প্রয়োজন"- বক্তব্যটির যথার্থতা।
সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। জাত-পাতের দোহায় দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সমাজের ধনিক শ্রেণি দমিয়ে রেখেছে, যা মানবিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তবে কিছু মানুষ আছেন যারা জাতপাতের এই অসারতা উপলব্ধি করে মানবিকতার জয়গানে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। রহিম চৌধুরীর মতো মানবিক মানুষরাই অভাগীর মতো দুঃখী মানুষের আশা পূরণে প্রকৃত সহায়ক।
উদ্দীপকের রহিম চৌধুরী মানবতাবাদী মানুষ। তিনি অঢেল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েও সাধারণ জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। নিজের মেয়ের বিয়েতে আপামর গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করে সাম্যবাদী চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার মতো মানুষ থাকলে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের অভাগীদের মতো দরিদ্র মানুষের আশা পূর্ণ হতো।
'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের অভাগী সমাজে তথাকথিত নীচ জাতের স্বামী-পরিত্যন্ত এক নারী। একমাত্র সন্তান কাঙালীকে নিয়ে সে কোনোক্রমে জীবন চালায়। কিন্তু দারিদ্র্যের কশাঘাতে সে বিনা চিকিৎসায়ই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার শেষ ইচ্ছা ছিল ছেলে কাঙালীর হাতের আগুন নিয়ে স্বর্গবাসী হওয়া। কিন্তু শোষক জমিদার জাত-পাতের বিভেদ-বৈষম্য করে কাঙালীকে তার মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে দেয় না। এক্ষেত্রে উদ্দীপকের রহিম চৌধুরীর মতো মানবতাবাদী মানুষ থাকলে অভাগীর আশা পূর্ণতা পেত। তাই বলা যায়, মন্তব্যটি যথার্থ।
