সজলের লোকসঙ্গীতের প্রতি প্রবল অনুরাগ থাকলেও তার বন্ধু কাজল মোটেই পছন্দ করে না। সে বলে, ‘এসব চাষাভুষার গান, এগুলো কে শোনে?” তার কথা শুনে সজল বলে, “আরে এগুলো আমাদের পল্লিসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। দেখছিস না, ইউরোপ, আমেরিকার মতো দেশ আজ লোকসঙ্গীতকে কত মর্যাদা দিচ্ছে? আমরা এসবের গুরুত্ব বুঝি না বলেই কদর করি না। আমি ঠিক করেছি শুধু গান নয়, পল্লিসাহিত্যের লুপ্তপ্রায় অন্যান্য সম্পদগুলোও যতটুকু পারি সংগ্রহ করব।”
মনসুর বয়াতি ছিলেন 'দেওয়ানা-মদিনা' লোকগাথার প্রখ্যাত কবি।
"পল্লিগ্রামে শহরের মতো গায়ক, বাদক, নর্তক না থাকলেও তার অভাব নেই" বলতে গ্রামের প্রকৃতির মধ্যে অনুরূপ নানা উপাদান বিদ্যমান থাকাকে বোঝানো হয়েছে।
পল্লি মানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবাধ ছড়াছড়ি। গ্রামের শ্যামল-কোমল সবুজরাজির মিলনে, নদীর কুলকুল শব্দে, পাখির কলকাকলিতে, পাতার মর্মর ধ্বনিতে, ফসলের মাঠে বাতাস বয়ে যাওয়ার সুরে এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শহরের তীব্র কোলাহলের মাঝে গায়ক-বাদক-নর্তকদের শিল্পধ্বনি এর কাছে ম্রিয়মাণ। পল্লির পরতে পরতে শিল্পের হর্ষধ্বনি প্রতিনিয়ত স্বতঃস্ফূর্ত। পল্লিতে কবিয়াল, গায়ক, বাদকের অভাব নেই। প্রশ্নোক্ত লাইন দ্বারা লেখক সেটিই নির্দেশ করেছেন।
কাজলের কথায় 'পল্লিসাহিত্য' প্রবন্ধের প্রতিফলিত দিকটি হলো লোকগানকে বর্বর চাষার গান বলে অবহেলা করা।
একটি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এক দিনে তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটি জাতির অস্তিত্বের বিকাশ ঘটে। সেই অস্তিত্ব মিশে থাকে তার পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে। তাই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধরে রাখা সবার কর্তব্য।
উদ্দীপকে সজলের বন্ধু কাজল লোকসংগীত মোটেই পছন্দ করে না। সে এগুলোকে চাষাভুষার গান বলে মনে করে। তার এ মনোভাবে 'পল্লিসাহিত্য' প্রবন্ধে বর্ণিত পল্লিগানকে অবহেলা করার দিকটি প্রকাশ পায়। 'পল্লিসাহিত্য' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন শিক্ষার কর্মনাশা স্রোত ও নাগরিক সভ্যতার নিগড়ে বন্দি হয়ে থাকার ফলে পল্লিসাহিত্য আজ অবহেলিত হচ্ছে। শহরবাসী গ্রামের সহজ-সরল জীবনকে ঘৃণা করে। শহুরে গানের প্রভাবে তারা পল্লির অমূল্য গানগুলোকে বর্বর চাষার গান বলে মনে করে। উদ্দীপকের কাজলের কথায় 'পল্লিসাহিত্য' প্রবন্ধের প্রতিফলিত দিকটি হলো এই লোকগানকে বর্বর চাষার গান বলে অবহেলা করার দিক।
“সজলের মনোভাবে ‘পল্লিসাহিত্য’ প্রবন্ধের মূল সুরটিই ধ্বনিত হয়েছে”— মন্তব্যটি যথার্থ।
লোকসাহিত্যের নানা উপাদান আমাদের দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। তাই পল্লিসাহিত্যের এসব সম্পদ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
‘পল্লিসাহিত্য’ প্রবন্ধে লেখক এদেশের ঐতিহ্যবাহী পল্লিসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার, তার বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে- উপযুক্ত গবেষক, সংগ্রাহক ও আগ্রহী মানুষের অভাবে এই মূল্যবান সম্পদগুলো আজ বিলুপ্তির পথে।উদ্দীপকের সজলের মনোভাব ঠিকই এই মূল সুরের প্রতিফলন। কারণ, কাজল লোকসঙ্গীতকে অবজ্ঞা করলেও সজল তা আমাদের পল্লিসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব দেয়। সে শুধু লোকসঙ্গীত নয়, পল্লিসাহিত্যের অন্যান্য লুপ্তপ্রায় উপাদানও সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার করে।
‘পল্লিসাহিত্য’ প্রবন্ধে যেমন লেখক এই সম্পদগুলো সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন, তেমনি সজলের আচরণে সেই আহ্বানের প্রতি সাড়া স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। তাই মন্তব্যটি যথার্থ।
