Listen to this article
A. Nayan
A. Nayan
21 May 2026 (4 months ago)
Dhaka, Narayanganj

আমি তোমায় ভালোবাসি নিরবে – কবিতা | লেখক: নয়ন

আমি তোমায় ভালোবাসি নীরবে

নীরব নিঃশব্দে গুঞ্জিত মহাকাল-সম

মম হৃদয়ে মায়া, মম প্রত্যাশা  

তুমি পূর্ণ করিবে সেই নিশীথিনী-সম

মম নয়ন দেখিলো আঁখিরও মায়া অন্ধকারে আলোর চাওয়া,

তব স্নিগ্ধ ছায়ায় হারায় হারায় সকল দুঃখের আচ্ছাদন ছাওয়া।

আমি চাইনি জাগিবে একাকী, তব অঞ্চল-ছায়া থাকিবে রূপরেখা,

ও আমায় তুমি রাখিলে মম জীবন পাবে নতুন শাখা-সম।

প্রেমের ব্যর্থ আবেগ, তব অভিসারে,  

মম পথ বেয়ে, তুমি গাইবে মধুর স্বরে।

তোমার স্মৃতির প্রান্তরে, চিরন্তন গান,  

তুমি মোর আশা, তুমি মোর প্রাণ।

বেদনায় ভরা রাতে, তুমি রবে আলোড়িত,  

নিবিড় নিভৃত পূর্ণিমা-নিশীথিনী, প্রেরণার স্রোত-সম।

মম জাগরণে অমর তোমার নাম,

তুমি রবে, রবে, হৃদয়ে প্রগাঢ়ের টান-সম।

আমার প্রেমে পরার গল্প

২০১২ সাল।
আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি। বয়সটা খুব ছোট ছিল, কিন্তু অনুভূতিগুলো ছিল অদ্ভুত গভীর। আমাদের স্কুলে নতুন একটি মেয়ে ভর্তি হলো। নাম তার শিখা। পরে সবাই তাকে তাসমিয়া নামে চিনলেও, আমার কাছে সে সবসময়ই “কবিতা” হয়ে রয়ে গেছে। কারণ তাকে দেখলেই মনে হতো—সে যেন শব্দ দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে তৈরি।

প্রথম দিন তাকে দেখেছিলাম স্কুলের করিডোরে। ছোট্ট মুখ, মায়াভরা চোখ আর এক অদ্ভুত মিষ্টি হাসি। জানিনা কেন, কিন্তু সেদিন থেকেই মেয়েটাকে অন্যরকম লাগতে শুরু করল। তখন প্রেম কি বুঝতাম না, ভালোবাসা কি সেটাও বুঝতাম না। কিন্তু এটুকু বুঝতাম—তাকে দেখলে আমার ভেতরে কেমন যেন শান্ত একটা অনুভূতি কাজ করত।

আমাদের বাড়ির পেছনে একটা বড় বন্যা ফুল গাছ ছিল। বিকেলবেলা আমি প্রায়ই গাছটার ওপরে বসে থাকতাম। একদিন শিখা তার চাচাতো বোন আফরিন আপুকে নিয়ে সেই গাছের নিচে এলো। আফরিন আপু আমাকে বলল,
“নয়ন, কয়েকটা ফুল পেড়ে দে তো।”

আমি গাছ থেকে ফুল পেড়ে দিলাম। তখন শিখা মিষ্টি করে বলল,
“আপু, আমাকেও বলোনা ফুল পেড়ে দিতে।”

আমি তার জন্যও ফুল পেড়ে দিলাম। আর ঠিক তখনই সে অনেক সুন্দর একটি হাসিটা দিয়েছিল- সেই হাসি আজও আমার মনের গভীরে রয়ে গেছে। মনে হয়েছিল পৃথিবীর সব সৌন্দর বুঝি ওই তার অই হাসি। হয়তো সেদিনই আমি প্রথম তার প্রেমে পড়েছিলাম।

তারপর থেকে প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে লক্ষ করতাম। অকারণে তার ক্লাসের সামনে যেতাম। বন্ধুদের নিয়ে তার ক্লাসের সামনে ভাব ধরতাম, ভালোবাসা শব্দটা মানুষের মুখ থেকে শুনে নিজের ভিতরেও কাজ করতে লাগলো। তারপর টানা ১২ বছর আমি কখনো তাকে বুঝতে দেইনি “আমি তোকে ভালোবাসি।”আমি শুধু অনুভব করেছি।

আমি তোমায় ভালোবাসি নীরবে”—এই লাইনটা আসলে আমার পুরো শৈশবকে ধারণ করে।

আমার অনুভূতিগুলো কখনো শব্দ হয়ে বের হয়নি, কিন্তু বছরের পর বছর নিঃশব্দে আমার ভেতরে বেঁচে ছিল। সময় বদলেছে, স্কুল বদলেছে, কিন্তু তাকে ঘিরে আমার অনুভূতিটা বদলায়নি।

ক্লাস সিক্সে আমি অনেক দূরে চলে যাই। নানির বাসায় থেকে পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু যত দূরেই যাই, আমার মনটা যেন বারবার সেই মানুষটার কাছেই ফিরে আসত। মা-বাবাকে যতটা মিস করতাম, তার থেকেও বেশি তাকে দেখতে ইচ্ছে করত। প্রতি সপ্তাহে শুধু তাকে একবার দেখব বলে মক্তবে আরবি পড়তে যেতাম।

এরপর ক্লাস সেভেনে আমি আবার সেই স্কুলেই ভর্তি হলাম যেখানে কবিতা পড়ত—আড়াইহাজার সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। ভর্তি হওয়ার ১ম দিন তাকে দেখে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছিল। তাকে সামনে দেখে আমি ইচ্ছে করেই লুকিয়ে যাচ্ছিলাম। পরে একদিন badminton খেলার সময় সে মুচকি হেসে বলেছিল,
“আমি তোরে দেখছি। তুই আমাক দেখে লুকাইতেছিলি।”

আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম,
“নতুন স্কুল, ১ম দিন, আবার তোকে দেখে লজ্জা পাইছিলাম।”

সেই মুহূর্তগুলো আজও মনে হলে বুকের ভেতর কেমন যেন আলোড়ন ওঠে।

আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল—যখন মাঝে মাঝে আমরা একসাথে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম। সাধারণ রাস্তা, সাধারণ বিকেল—কিন্তু আমার কাছে সেগুলো ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ মুহূর্ত।

ক্লাস নাইনে উঠে আমার সব বন্ধুরা মানবিক বিভাগে ভর্তি হলো। আমিও ওদের সাথে মানবিকে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কবিতা বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলো। আমি এক মুহূর্তও ভাবিনি। আমিও বিজ্ঞানেই ভর্তি হয়ে গেলাম। কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম- আমি আসলে নিজের জন্য না, তার কাছাকাছি থাকার জন্যই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।

তারপর করোনা এলো। স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘদিন কথা হয়নি। দূরত্ব যেন ধীরে ধীরে আমাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিল। কিন্তু—দূরত্ব আমার অনুভূতিগুলোকে কমায়নি, বরং আরও গভীর করেছে।

বিদায় অনুষ্ঠানে আমি তাকে একটি gift দিয়েছিলাম—একটি ডায়েরি, একটি কলম আর একটি হাতঘড়ি। হয়তো ছোট একটা উপহার ছিল, কিন্তু সেই gift-এর ভেতরে আমার অনেক না বলা অনুভূতি লুকিয়ে ছিল।

এরপর group study-এর অজুহাতে প্রথমবার তার বাসায় যাওয়া। তারপর WhatsApp-এ কথা বলা শুরু। আর সেখান থেকেই আমি নতুন করে তাকে আবিষ্কার করলাম।

তার কথা বলার ভঙ্গি ছিল অদ্ভুত সুন্দর। রাগের মধ্যেও মায়া ছিল। ঝগড়ার মধ্যেও কোমলতা ছিল। আমি যখন রাতের আকাশের ছবি দিয়ে মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে কথা বলতাম, সে বিরক্ত হয়ে বলত,
“তুই না সব কিছু নিয়া সিরিয়াস।”

আবার সেই মেয়েটাই উদ্ভিদ, পড়ালেখা—এসব নিয়ে আমার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক করত।

আমার কাছে সেই কথোপকথনগুলো শুধু chat ছিল না। সেগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে জীবন্ত স্মৃতি।

তোমার স্মৃতির প্রান্তরে, চিরন্তন গান”—এই লাইনটা তাই শুধু কবিতা না, আমার জীবনের সত্য।

বন্য ফুল গাচের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা,
একতারা গান গাওয়া,
আমার হারানো admit card খুঁজে দেওয়া,
WhatsApp-এ রাগ করা,
আবার হঠাৎ হাসি দিয়ে কথা বলা—

এসব মিলেই সে আমার স্মৃতির সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে গেছে।

আমি কখনো চাইনি সে শুধু একটা স্মৃতি হয়ে যাক। আমি চেয়েছিলাম—সে আমার জীবনের পাশে থাকুক। সম্পর্কের নাম থাকুক বা না থাকুক, অন্তত অনুভূতিটা সত্য হোক।

কারণ আমার কাছে কবিতা শুধু একজন মানুষ না।
সে আমার নীরবতা,
আমার একাকিত্বের আলো,
আমার অনুভূতির আশ্রয়,
আমার কবিতার অনুপ্রেরণা।

আমি যখন রাতে ঘুমাতে যাই, তখনও তার কথা মনে পড়ে। যখন কোনো সুন্দর গান শুনি, গানের meaning যেন তাকেই অনুভব করি। যখন কোনো কবিতা লিখি, তখন বুঝি—আমার শব্দগুলোর ভেতরে সে লুকিয়ে আছে।

মম জাগরণে অমর তোমার নাম” এই লাইনটা তাই শুধু কবিতা না, আমার সত্যিকারের বাস্তবতা।

আমি জানিনা ভবিষ্যৎ কি? জানিনা কোনোদিন এই গল্প পূর্ণতা পাবে কিনা। হয়তো বাস্তবতা অন্যরকম হবে। হয়তো সময় আমাদের দুইদিকে নিয়ে যাবে।

তবুও একটা সত্য আমি অস্বীকার করতে পারি না—

আমি তাকে ভালোবেসেছি নীরবে।
নিঃশব্দে।

দীর্ঘ বছর ধরে।

আর সে আমার হৃদয়ে রয়ে যাবে—
একটা প্রগাঢ় টানের মতো,
যা সময় মুছে ফেলতে পারে না।

128 Views
No Comments
Share
2
No comments to “আমি তোমায় ভালোবাসি নিরবে – কবিতা | লেখক: নয়ন ~ thought: Tasmia Jahan kobita”

Author Image
কবিতাঃ আপনভূমির ভাষা | লেখকঃ নয়ন
-
👍🏻 - -