বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার পাঠ শেষ করতে করতেই আমার বোনের অনেক বয়স হয়ে যায়। তিন তিনবার তার বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে যাবার পর কেমন যেন হতাশ হয়ে পড়ি। একদিন তাকে ডেকে বলি, ‘সানজিদা, কাল বাসায় একটি নতুন বরপক্ষ তোকে দেখতে আসবে।’ শুনে ওর চেহারা কঠিন হয়ে ওঠে, বলে, ‘তুই শুধু শুধু ব্যস্ত হচ্ছিস তপন, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আমার যা কাজ তা জীবনভর শেষ হবার নয়।’
‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমকে ‘মাকাল ফল’ বলে বিদ্রূপ করা হয়েছে। বাইরে থেকে তাকে খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে হলেও ভেতরে তার ব্যক্তিত্ব, সাহস ও আত্মসম্মানের অভাব ছিল। তাই তাকে ‘মাকাল ফল’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
অনুপম মহাসমারোহে বিয়ে করতে গিয়েছিল। সে ছিল ধনী পরিবারের ছেলে, তাই তার বিয়েতে ছিল আভিজাত্যের ছাপ। ব্যান্ডপার্টি, শঙ্খধ্বনি, আলোকসজ্জা— কোনো কিছুরই কমতি ছিল না।
অনুপম দামি পোশাক ও গয়নায় সজ্জিত ছিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সে খুব গর্ব ও জাঁকজমকের সঙ্গে বিয়ের আসরে যাচ্ছে। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে তার নিজের কোনো দৃঢ়তা বা স্বাধীন মতামত ছিল না। সবকিছুতেই সে মামার কথার ওপর নির্ভর করত।
উদ্দীপকের সানজিদা এবং ‘অপরিচিতা’ গল্পের কল্যাণীর মধ্যে কিছু মিল ও অমিল দেখা যায়।
সাদৃশ্য:
- দুজনেই আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন নারী।
- তারা সমাজের প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছে।
- বিয়েকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করেনি।
- মানুষের কল্যাণ ও সেবামূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে চেয়েছে।
বৈসাদৃশ্য:
- সানজিদার বিয়ে বারবার ভেঙে যাওয়ায় সে হতাশ হয়ে সমাজসেবায় মন দেয়।
- কিন্তু কল্যাণী ছিল দৃঢ়চেতা ও প্রতিবাদী। সে অন্যায় যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনুপমকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
- সানজিদা পরিস্থিতির কারণে বিয়ে থেকে দূরে সরে যায়, আর কল্যাণী নিজের আদর্শ ও আত্মসম্মানের জন্য সেই সিদ্ধান্ত নেয়।
এভাবে দেখা যায়, দুজনের লক্ষ্য মানবসেবা হলেও তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ ভিন্ন।
ঘ. উদ্দীপকটিতে ‘অপরিচিতা’ গল্পের মূল বক্তব্য কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে? যৌক্তিক বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপকটিতে ‘অপরিচিতা’ গল্পের মূল বক্তব্য আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
‘অপরিচিতা’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নারীর আত্মমর্যাদাবোধের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। গল্পের কল্যাণী ছিল সাহসী, শিক্ষিত ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন একজন নারী। সে বিয়েকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য মনে করেনি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে নিজের আদর্শকে গুরুত্ব দিয়েছে।
উদ্দীপকের সানজিদার মধ্যেও একই ধরনের আত্মসম্মানবোধ ও দৃঢ় মানসিকতা দেখা যায়। বারবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরও সে ভেঙে পড়েনি। বরং সমাজের প্রতিবন্ধী মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে। এতে বোঝা যায়, সে বিয়ের চেয়ে মানবসেবাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে ‘অপরিচিতা’ গল্পে যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ এবং নারী জাগরণের শক্ত বার্তা রয়েছে। কল্যাণী ও তার বাবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্দীপকে সেই প্রতিবাদী দিকটি স্পষ্টভাবে নেই। এখানে মূলত একজন নারীর মানসিক দৃঢ়তা ও মানবসেবার দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।
সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে ‘অপরিচিতা’ গল্পের নারীর আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের দিকটি ফুটে উঠলেও গল্পের সম্পূর্ণ মূল বক্তব্য প্রতিফলিত হয়নি।