১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের উপর বৈষম্যনীতি শুরু করে। তারা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। কিন্তু এদেশের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা এর বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ করে এবং বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দেয়।
শূন্য থালা হাতে পথের ধারে হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী বসে ছিল।
“আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়” বলতে কবি বাঙালির বারবার রক্ত দেওয়ার দিকটিকে বুঝিয়েছেন।
বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় পলাশির প্রান্তরে। এরপর সিপাহি বিদ্রোহ, তিতুমীরের আন্দোলন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, সূর্যসেন-প্রীতিলতাদের আন্দোলন- এভাবে স্বাধীনতার জন্য বহুবার রক্ত দিয়েছে এ দেশের সাধারণ জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের আগেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে রক্ত ঝরিয়েছে বীর বাঙালি জাতি। স্বাধীনতার জন্য এত সব আন্দোলনে বারবার বীর বাঙালি রক্ত দিয়েছে বলেই কবি এ কথা বলেছেন।
উদ্দীপকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আচরণে 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতার মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর করা হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় 'পাকিস্তানি সেনাদের বাঙালির ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন করার চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করতে তারা মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালায়। মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালির রক্তে তারা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়। বাঙালির জীবনকে নরকে পরিণত করতে শহরের বুকে ট্যাংক দিয়ে গণহত্যা চালায়। তারা এ দেশের বুকে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো গর্হিত কাজ করে।
উদ্দীপকে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক নীতির কথা বলা হয়েছে। তারা জোর করে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে চায়। অথচ পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালি। পাকিস্তানি শাসকের অন্যায় ও স্বেচ্ছাচারী নির্দেশের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়ায়। এদেশের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়। উদ্দীপক ও কবিতা উভয় জায়গায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাঙালিদের ওপর নির্মম অত্যাচারের দিকটি ফুটে উঠেছে। এভাবে কবিতায় পাকিস্তানিদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর করা অত্যাচারের দিকটি উদ্দীপকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আচরণের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কবি বাঙালিদের স্বাধীনতার জন্য যে ঐক্যবদ্ধ জাগরণ ও আত্মত্যাগের চেতনা তুলে ধরেছেন তার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় “উদ্দীপকের ছাত্র-শিক্ষকসহ জনতার ভূমিকাই 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতার কবির মনে আশা জাগিয়েছে”- মন্তব্যটি যথার্থ।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কবি এদেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ জাগরণ ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে। বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় অসীম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। তারা শক্ত হাতে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা, আধুনিক অস্ত্রের ঝংকারকে প্রতিহত করেছে। একের পর এক আঘাত হেনে শত্রুদের পরাজিত করে বাঙালিরা মহান স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।
উদ্দীপকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাঙালিদের ওপর করা বৈষম্যনীতি ও অন্যায়-অত্যাচারের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। বাঙালিরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হলেও তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চায়। তাদের এ অন্যায় নির্দেশ এ দেশের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা মেনে নেয় না। তারা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের মতো দৃঢ়চেতা ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। এ দিক থেকেই কবিতার কবির মনে স্বাধীনতা লাভের আশা জাগে। তাই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন- “এই বাংলায়, তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা” কথাটি।
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় কবি বাঙালির আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের কথা তুলে ধরেছেন। বাঙালির এই আত্মত্যাগ ও বীরত্ব দেখে কবির মনে স্বাধীনতা লাভের আশা দৃঢ় হয়। উদ্দীপকেও তা লক্ষ করা যায়। এখানে মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাংলার ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দেয়। এভাবে উদ্দীপকের ছাত্র-শিক্ষকসহ আপামর জনতার আত্মত্যাগ আলোচ্য কবিতার কবির মনে আশা জাগিয়েছে।
