বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে- ‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে। বাঙালির মতো জ্ঞান-শক্তি ও প্রেম-শক্তি (ব্রেন সেন্টার ও হার্ট সেন্টার) এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোনো জাতির নেই। কিন্তু কর্মশক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তাদের কর্মবিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ তারা তামসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে চেতনাশক্তিকে হারিয়ে ফেলেছে।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বাঙালিদের 'মূর্তিমতী কবিতা' বলেছেন।
"আমরা কোমলাঙ্গ- তাঁহারা কোমলাঙ্গী"- লাইনটি দ্বারা বাঙালি পুরুষ ও স্ত্রীলোককে বোঝানো হয়েছে।
বাঙালি পুরুষেরা সাধারণত শ্রমবিমুখ, তারা পরিশ্রম স্বীকার করতে চায় না, সহজে ও ফাঁকি দিয়ে যে কাজ উদ্ধার করা সম্ভব, সেটাই করতে উন্মুখ। তারা কঠিন পরিশ্রম আছে, এমন ব্যাবসা করে না। রৌদ্রে গিয়ে মাঠের ফসল তদারক করে না। পরিশ্রম করে বিদ্যার্জন করে না। এজন্য তাদেরকে কোমলাঙ্গ বলা হয়েছে। সাধারণত পুরুষকে অর্ধাঙ্গ ও স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গী বলা হয়। সেই বিবেচনাতেই লেখিকা বাঙালি পুরুষকে কোমলাঙ্গ আর স্ত্রীলোককে কোমলাঙ্গী বলেছেন।
বাঙালির অলসপ্রিয়তা ও কর্মবিমুখতার বিষয়ে উদ্দীপকের সঙ্গে 'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধের সাদৃশ্য রয়েছে।
'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধে লেখিকা দেখিয়েছেন যে বাঙালি জাতি নিজের বোকামি ও কুসংস্কারের শিকার হয়েও নিজেকে পরিবর্তন করতে চায় না। এই নিষ্ক্রিয়তা মূলত শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির অভাবের কারণে সৃষ্টি হয়। তাই তিনি বাঙালি জাতির জাগরণের জন্য শিক্ষার প্রসারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধে দেখা যায়, বাঙালি অনেক বেশি আরামপ্রিয়। তারা সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাই কোনো পরিশ্রমের কাজ করতে তারা নারাজ। বাঙালি অনুকরণপ্রিয়। কঠোর পরিশ্রম করে কোনোকিছু তারা আবিষ্কার করতে চায় না; বরং অন্যের আবিষ্কারকে তারা অনুকরণ করে। এভাবে অনুকরণ ও আরামপ্রিয়তার কারণে তাদের মেধা, জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। উদ্দীপকেও বাঙালির কর্মবিমুখতার গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। তাদের আলস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা প্রভৃতি তাদের ব্যাবসাবাণিজ্যে অনিচ্ছার কারণ। এভাবে উদ্দীপক ও 'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
আলস্য ও কর্মশক্তির অভাবে বাঙালি জাতির অবনতি- এই দিক থেকে "উদ্দীপক ও 'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধের মূলভাব একসূত্রে গাঁথা” মন্তব্যটি যথার্থ।
নিরীহ বাঙালি নামটি মূলত একটি বিদ্রূপাত্মক ব্যঞ্জনা বহন করে। লেখিকা এখানে বাঙালিকে সরাসরি 'নিরীহ' না বলে, বরং তার অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তার প্রতি কটাক্ষ করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন যে, এই নিরীহ ভাবটি আসলে একটি কৃত্রিম লেবাস, যা বাঙালিকে তার দুর্বলতা ও দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় না।
'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক বলেছেন, বাঙালি পুরুষরা অলসতাপ্রিয় এবং শারীরিক পরিশ্রমবিমুখ। তাই তারা কৃষিকাজ, ব্যাবসাবাণিজ্য করতে চায় না। নিজেদের মেধাকেও তারা কাজে লাগাতে জানে না। তারা কেবল অন্যকে অনুকরণ করতে পারে। অন্যদিকে বাঙালি নারীরাও পরিশ্রমবিমুখ। তারা অহেতুক রূপচর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং সর্বক্ষেত্রে নিজেদের অবলা বলে প্রমাণিত করতে চায়। উদ্দীপকেও বাঙালির এই কর্মবিমুখতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বাঙালির জ্ঞান-শক্তি, প্রেম-শক্তি থাকা সত্ত্বেও কর্মশক্তির অভাবে এসব কোনো কাজে আসছে না। আলস্য, জড়ত্ব, তন্দ্রা তাদেরকে কর্মবিমুখ করে রেখেছে।
উদ্দীপক ও 'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধের তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যায় যে, উভয় স্থানেই বাঙালির কর্মবিমুখতার বিষয়টিকে তুলে ধরা হয়েছে। উভয় স্থানেই বলা হয়েছে যে, আরামপ্রিয়তা ও কর্মবিমুখতার কারণে বাঙালি নিজ কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না। কর্মশক্তির অভাবে বাঙালির এই অবনতি উদ্দীপক ও 'নিরীহ বাঙালি' প্রবন্ধের মূলভাব। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
