বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরূপ দেখিতেন; কেননা মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন- কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন। বরঞ্চ কন্যার পিতা বাণীকণ্ঠ সুভাকে তাঁহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসিতেন; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন।
'জিউ' শব্দের অর্থ আয়ু, জীবিত থাকা।
"দোসর-জনম দিলা তিহ সে আহ্মার।" বলতে শিক্ষকের শিক্ষাদানের মাধ্যমে দ্বিতীয় জীবন পাওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মধ্যযুগীয় পরিমণ্ডলে রচিত 'বন্দনা' কবিতায় কবি মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠায় শিক্ষকের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন। তৎকালীন সমাজে অধিকাংশ মানুষ ছিল অক্ষরজ্ঞানহীন। একমাত্র গুরু বা ওস্তাদের হাত ধরেই শিক্ষার আলোয় পৌঁছানো যেত। অন্ধকার জীবন থেকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাকে কবি 'দ্বিতীয় জন্ম' বলে অভিহিত করেছেন। আর এই জীবনের কর্ণধার গুরু তথা শিক্ষকের হাত ধরেই মানুষ 'দ্বিতীয় জন্ম' লাভ করে। তাই কবি শিক্ষককে দ্বিতীয় জীবনদাতা বলে উল্লেখ করেছেন।
'সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ-মমতা ও কল্যাণদৃষ্টির দিক থেকে উদ্দীপকের মায়ের সঙ্গে 'বন্দনা' কবিতার মায়ের বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'বন্দনা' কবিতায় মাতৃস্নেহ ও পিতৃত্যাগের এক চিরন্তন রূপ ফুটে উঠেছে। এটি শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, সমাজজীবনের নৈতিক ভিত্তিকেও মজবুত করে।
'বন্দনা' কবিতায় কবি তার জীবনে মায়ের অবদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। মায়ের স্নেহ-মমতার তুলনা নেই। মায়ের সদাজাগ্রত কল্যাণদৃষ্টি সন্তানের জীবন-পথের পাথেয়স্বরূপ। শিশুকে মা বহু যত্নে লালন-পালন করেন। কবি তার স্নেহময়ী মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে উদ্দীপকে দেখা যায় ভিন্ন রূপ। উদ্দীপকের মা তার সন্তানকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখেন। কন্যার অসম্পূর্ণতাকে মা নিজের লজ্জার কারণ হিসেবে নিয়ে সন্তানের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। কন্যাকে তিনি নিজের গর্ভের অভিশাপ মনে করেন। এভাবে উদ্দীপকের মায়ের ভাবনা 'বন্দনা' কবিতার মায়ের ভাবনার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে সন্তানের প্রতি মায়ের অবহেলা প্রকাশ পাওয়ায় বলা যায়, "উদ্দীপকটি যেন 'বন্দনা' কবিতার মূলভাবের বিপরীত চিত্র ধারণ করেছে" মন্তব্যটি যথার্থ।
'বন্দনা' কবিতায় কবি মানবজীবনের শুরুতে পিতা-মাতার অবদানের প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন। তিনি তাদের 'যান দয়া হন্তে জন্ম হৈল বসুধায়' চরণের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতার অনন্য রূপ প্রকাশ করেছেন। এটি পারিবারিক মূল্যবোধের এক গভীর বার্তা বহন করে।
'বন্দনা' কবিতায় কবি মানবজীবনে মা-বাবার গুরুত্ব ও অবদান স্বীকার করেছেন। পিতা-মাতার দেহ থেকেই সন্তানের উদ্ভব। নবজাতক অবস্থায় শিশুকে সম্পূর্ণরূপে পিতা-মাতার অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হয়। মা পরম যত্নভরে সন্তানের প্রতি তার প্রতিটি দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছিলেন বলেই কবি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পেরেছেন বলে স্বীকার করেছেন। উদ্দীপকে 'বন্দনা' কবিতার মায়ের ঠিক বিপরীত চরিত্রের মাকে পাওয়া যায়। কন্যার শারীরিক অসম্পূর্ণতা নিয়ে উদ্দীপকের মা খুবই বিরক্ত। তিনি তার সন্তানকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখেন।
উদ্দীপকের মায়ের মাঝে মাতৃসুলভ বৈশিষ্ট্যের বিপরীত আচরণ দৃশ্যমান হয়েছে। অন্যদিকে 'বন্দনা' কবিতায় কবি তার জীবনে মায়ের স্নেহ-মমতা ও কল্যাণদৃষ্টিকে তুলে ধরেছেন। মায়ের আদর-যত্ন ও পরিচর্যার মধ্য দিয়েই কবি পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কবি অকপটে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেন। এদিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
