বৈকুণ্ঠ সাহার গদিতে ডাকাতি করিতে গিয়া তাহাদের দলকে-দল ধরা পড়িয়া যায়। এগারজনের মধ্যে কেবল ভিখুই কাঁধে একটা বর্শার খোঁচা খাইয়া পলাইতে পারিয়াছিল। […] বন কাছেই ছিল মাইল পাঁচেক উত্তরে। ভিখু অগত্যা বনেই আশ্রয় লইল। […] রাত্রে ভিখুর জ্বর আসিল। […] সবুজ রঙের একটা সাপকে একবার মাথার কাছে সিন্জুরি, গাছের পাতার ফাঁকে উঁকি দিতে দেখিয়া পুরা দুঘণ্টা লাঠি হাতে সেদিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল এবং […] যথাসাধ্য শব্দ করিয়া সাপ তাড়াইতে লাগিল। মরিবে না। সে কিছুতেই মরিবে না। বনের পশু যে অবস্থায় বাঁচে না, সেই অবস্থায়, মানুষ সে বাঁচিবেই।
ধরায় বা পৃথিবীতে প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত।
কবি পৃথিবীর মধ্যে অনন্তকাল সমাদরে বেঁচে থাকার জন্য জীবন্ত হৃদয়ে স্থান পেতে চান।
কবি পরলোকে বিলীন হতে চান না; বরং তিনি মানুষের মনে চিরকাল বেঁচে থাকতে চান। মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার অর্থ হলো তার রচনা ও কীর্তি মানুষের স্মৃতিতে অমলিন থাকা। কবির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, পৃথিবীর নর-নারী সানন্দে তার সৃষ্টিকর্মকে হৃদয়ে ধারণ করবেন। তাই তিনি সুন্দর এই পৃথিবীতে মানবসমাজের অংশ হয়ে থাকতে চান এবং মানুষের মাঝে তাঁর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চান।
উদ্দীপকের ভিখুর কিছুতেই মরতে না চাওয়ার মধ্যে 'প্রাণ' কবিতার কবির শুভকর্মের মাধ্যমে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার 'দিকটি ফুটে উঠেছে।
'প্রাণ' কবিতায় কবি সৃষ্টির মাধ্যমে মৃত্যুকে পরাজিত করতে চান। চিরন্তন সত্য মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা চিরন্তন। পৃথিবীতে মানুষ যদি মহৎ কর্মের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভকরতে পারে তবেই সে জগতে অমর হয়ে থাকবে।
উদ্দীপকের ঘটনাংশে লক্ষ করা যায়, ভিখু ডাকাতি করতে গিয়ে তার পুরো দল মারা গেলেও কাঁধে বর্শার আঘাত নিয়ে সে বেঁচে যায়। সে পার্শ্ববতী একটি জঙ্গলে আশ্রয় নেয় এবং যেকোনো পরিস্থিতিতেই তার জীবন টিকিয়ে রাখতে চায়। মানুষের বেঁচে থাকার এই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা 'প্রাণ' কবিতার মধ্যেও ব্যক্ত হয়েছে। কবি এখানে তাজা ফুলের সুগন্ধির মতোই সকলের কাছে চিরন্তনভাবে সমাদৃত হতে চেয়েছেন। তবে 'প্রাণ' কবিতায় কবি মহৎকাজ করে জগতে বেঁচে থাকার দৃঢ়সংকল্প করলেও উদ্দীপকের ভিখু তা করেনি, সে যেকোনো প্রকারে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চায়। এখানে তার সৎকর্ম বা অসৎকর্ম কোনো বিষয় নয়। উদ্দীপক এবং 'প্রাণ' কবিতার মূলভাব পর্যালোচনায়, উদ্দীপকের ভিখুর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা 'প্রাণ' কবিতার মূলভাবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে বলা যায়, "সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকটি 'প্রাণ' কবিতার সমগ্র ভাব ধারণ করতে পারেনি"- মন্তব্যটি যথাযথ।
'প্রাণ' কবিতাটি মূলত জীবন, ভালোবাসা ও সৃষ্টিশক্তির জয়গান। কবি এখানে মৃত্যুভয়কে নয়, বরং জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগ ও মানবপ্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মরতে চান না, কেননা, এই পৃথিবী, প্রকৃতি ও মানবসমাজই তাঁর আনন্দ ও সৃষ্টির ক্ষেত্র। এই সৃষ্টির মধ্যেই তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চান।
উদ্দীপকের ঘটনাংশে লক্ষ করা যায়, ডাকাতি করতে গিয়ে এগারোজনের মধ্যে কেবল ভিখুই কোনো রকমে পালিয়ে যায়। এক হাতে বর্শার আঘাত নিয়েই সে পালায়। সে কোনো রকমে পাশের জঙ্গলে গিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করে। সে যেকোনো প্রকারে বেঁচে থাকতে চায়। যে অবস্থায় বনের পশু-পাখি পর্যন্ত মরে যায়, সেই অবস্থায়ও সে বেঁচে থাকার দৃঢ় চেষ্টা করে। বেঁচে থাকার এই দৃঢ় সংকল্পের দিক থেকে 'প্রাণ' কবিতার সঙ্গে উদ্দীপকের বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে 'প্রাণ' কবিতায় কবি মহৎকর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে অমর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু উদ্দীপকে তা প্রকাশ পায়নি।
'প্রাণ' কবিতায় কবি মহৎকর্মের মধ্য দিয়ে জগতে অনন্তকাল বেঁচে থাকতে চান। তিনি শুকনো ফুলের ন্যায় অনাদৃত না হয়ে তাজা ফুলের সুগন্ধ ছড়িয়ে সকলের মনে বিরাজ করতে চান অনন্তকাল। উদ্দীপকে ভিখুর প্রত্যাশা তা নয়। এদিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
