ছোটো সাফিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত, মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। প্রচণ্ড জ্বরে কখনো প্রলাপ বকছে, কখনো নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকছে।ছেলের এই অবস্থায় মা শায়লা দিশেহারা হয়ে পড়েন। কখনো কবিরাজের কাছে যান, কখনো জায়নামাজে বসেন আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে। মায়ের অস্থিরতা দেখে চিকিৎসক অভয় দিয়ে বলেন-পূর্ণ বিশ্রাম আর বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ালে ধীরে ধীরে আপনার ছেলে সুস্থ হয়ে উঠবে।
হুমায়ুনের চারপাশে মরণ-অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
জীবন-প্রদীপ নিভিয়া আসিছে অস্তরবির প্রায়- কথাটি দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন, বাদশাজাদা হুমায়ুনের জীবন অস্তপ্রায় সূর্যের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুন কঠিন রোগে আক্রান্ত। রাজ্যের যত বিজ্ঞ হাকিম, কবিরাজ, দরবেশ দিন-রাত তার চিকিৎসায় ব্যস্ত। সেবা-যত্নের কোনো ত্রুটি নেই। কিন্তু বাদশাজাদার কঠিন রোগ কিছুতেই সারে না। যত দিন যাচ্ছে ততই দুর্ভোগ বেড়ে চলেছে। হুমায়ুনের জীবনপ্রদীপ অন্তপ্রায় সূর্যের মতো নিভে যেতে বসেছে। দিনের শেষে সূর্য যেমন পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে যায় তেমনই বাদশাজাদা হুমায়ুনের জীবনও শেষ হয়ে যাচ্ছে- কবি আলোচ্য চরণটির মধ্য দিয়ে এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
উদ্দীপকের সাথে 'জীবন বিনিময়' কবিতায় বর্ণিত বাদশা বাবরের সন্তানের জন্য আত্মোৎসর্গের দিকটির বৈসাদৃশ্য রয়েছে।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহ-বাৎসল্যের একটি মহৎ দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে। মোগল সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুন কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকরা যখন হাল ছেড়ে দেন, তখন বাবর এক দরবেশের পরামর্শে ছেলের সুস্থতার জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত হননি।
উদ্দীপকের মা শায়লার অসুস্থ ছেলের প্রতি স্নেহ-কাতরতা প্রকাশ পেয়েছে। ছেলের সুস্থতার জন্য তিনি কবিরাজের কাছে যান, আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। সন্তানের জন্য হৃদয়ের কাতরতা প্রকাশ পেলেও 'জীবন বিনিময়' কবিতায় বর্ণিত বাদশা বাবরের সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করার দিকটি উদ্দীপকে নেই। এ দিক থেকে উভয়ের মধ্যকার বৈসাদৃশ্য দেখা যায়।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় বর্ণিত সন্তানের সুস্থতার জন্য জীবনদানের বিষয়টি না থাকলেও সন্তানের প্রতি স্নেহ-কাতরতার উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান থাকায় আলোচ্য মন্তব্যটি যুক্তিযুক্ত।
'জীবন বিনিময়' কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়- পিতার স্নেহ-বাৎসল্যের কাছে মৃত্যুর পরাজয়। হুমায়ুন কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে পিতা বাবর তার জীবন দিয়ে সন্তানকে সুস্থ করে নিজে মৃত্যুকে বেছে নেয়। সন্তানের প্রতি পিতার অপরিসীম ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে কবিতাটিতে।
উদ্দীপকের শায়লার মাঝেও প্রকাশ পেয়েছে সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ-কাতরতা। ছোটো সন্তান সাফিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। কবিরাজ-ডাক্তার দেখান, আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন। সন্তানের অসুখে এমন কাতরতা 'জীবন বিনিময়' কবিতায় বর্ণিত বাদশা বাবরের চাঞ্চল্যের সঙ্গে সাদৃশ্যব্যঞ্জক।
'জীবন বিনিময়' কবিতায় বর্ণিত বাদশা বাবর সন্তানের সুস্থতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত হননি। উদ্দীপকের শায়লাও সন্তানের অসুস্থতায় দিশেহারা হয়েছেন। তিনি হয়তো প্রাণদানেও কার্পণ্য করতেন না। ফলে 'জীবন বিনিময়' কবিতার বাদশা বাবরের এবং শায়লার সন্তানের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যে মৌলিক পার্থক্য নেই। তাই বলা যায় যে, “বৈসাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপকের মা 'জীবন বিনিময়' কবিতার সম্রাট বাবরের চেতনাকে ধারণ করে আছেন।"-মন্তব্যটি যৌক্তিক।
