দৃশ্যকল্প-১ :
‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।
পুড়ছে দোকান-পাট, কাঠ,
লোহা-লক্করের স্তূপ, মসজিদ এবং মন্দির।
দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার।
বিষম পুড়ছে চতুর্দিকে ঘর-বাড়ি।’
দৃশ্যকল্গ-২:
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশি।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
অবুঝ শিশু পিতা-মাতার লাশের উপর হামাগুড়ি দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধ্বংস করার জন্য শহরের বুকে পাকবাহিনীর জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো।
ট্যাঙ্ক আধুনিক শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র। এটি অনেক বড়ো ও শক্তিশালী। বিশাল আকারের কামান নিয়ে এটি যেকোনো জায়গায় অনায়াসে যেতে পারে। ট্যাংকের কামান এতই শক্তিশালী যে, মুহূর্তের মধ্যে এটি বড়ো বড়ো স্থাপনাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দেয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতে বাঙালিদের ওপর বীভৎস ও ভয়ংকর আক্রমণ চালায়। উদ্দেশ্য বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া। আর এজন্যই শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো।
দৃশ্যকল্প-১এর সাথে 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা' কবিতায় উল্লিখিত পাকিস্তানি সৈন্যদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দিকটির মিল রয়েছে। এটি উদ্দীপক ও কবিতার সার্থে সম্পর্কযুক্ত।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতের ভয়াবহতা পৃথিবীতে বিরল। ইতিহাসের এ বর্বরতম হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছিল পাকিস্তানি শাসক বাহিনী। মূলত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর বীর বাঙালি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে থাকে। এরপর থেকে পাকিস্তানি বাহিনী বর্বর হামলার ছক কষতে থাকে। যেটা শুরু হয় ২৫শে মার্চের কালরাতে। এসময় তারা বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য, সম্পদশূন্য সেইসাথে জনশূন্য করার মানসে নির্বিচারে হত্যা ও অগ্নিসংযোগ করতে থাকে।
কবিতার মতো দৃশ্যকল্প-১এ আমরা এসবেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। এখানে স্বাধীনতা লাভের মানসে বাঙালির যে ত্যাগ বা পাকিস্তানি বাহিনীর যে বর্বরতার চিত্র দেখতে পাই, তা কবিতার সাথে মিলে যায়। তবে সর্বাংশে নয়। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’- কবিতায় কবি শামসুর রাহমান পাকিস্তানিদের বর্বরতার আরো ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপন করেছেন। তাদের এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের দিকটি উপস্থাপনের সূত্রে উদ্দীপকের সাথে এ কবিতার মিল পরিলক্ষিত হয়।
দৃশ্যকল্প-২ এ ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’ কবিতার সমগ্রভাব ফুটে ওঠেনি বরং এখানে একটি বিশেষ দিককে তুলে ধরা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষন দেন। যা বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপরেখা হিসেবে পরিগণিত। এরপর থেকে বীর বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। বাংলার দামাল ছেলেরা প্রতিবাদের খড়গ হাতে নিয়ে সারাদেশে ছোটো ছোটো গ্রুপে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এটা বুঝতে পেরে ২৫শে মার্চের কালরাতে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ড ঘটায়। বাঙালি আর নিজেকে সংযত রাখে না। জীবন বাজী রেখে যে যার অবস্থান থেকে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে। এ সংগ্রামে নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। আর সে সময়ের একটি চিত্র দৃশ্যকল্প-২ এ উপস্থাপিত হয়েছে। মূলত ক্ষেত-খামারে খেটে খাওয়া যুবকের যুদ্ধাংদেহী মনোভাব ও দুর্গম প্রান্তরে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।
কবি শামসুর রাহমান তার ‘তোমাকে পাওয়া জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় বাঙালির সমগ্র আত্মত্যাগকে কবিতায় তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। মোটকথা বাঙ্গালি স্বাধীনতা অর্জনের পথে কি কি বিসর্জন দিয়ে আজকের এ লালসবুজের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল তারই একটি দৃষ্টান্ত এ কবিতাটি। আর এ কবিতার খন্ডাংশ প্রতিধ্বনিত হয়েছে দৃশ্যকল্প-২এ।
তাই একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, দৃশ্যকল্প-২ কখনো কবিতার সমস্ত ভাব ধারণ করেনি।
