দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুলবানুর ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া শিখে স্বনির্ভর হবে। বাবার সহযোগিতায় সে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শিখে পরবর্তীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও অদম্য ইচ্ছার কাছে হার মেনেছে অন্ধত্বের অভিশাপ।
সমাজ দৃষ্টিহীনদের অবজ্ঞা করে।
"দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে" বলতে কবি অন্ধবধূর অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিতকরণ বা অনুভূতির তীক্ষ্ণতাকে বুঝিয়েছেন।
সমাজের দৃষ্টিহীনেরা নিজেদের অসহায় ভাবে। তারা সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ। ইন্দ্রিয়সচেতনতা তাদের এই প্রতিবন্ধিতা দূর করতে পারে। কারণ তারা অনুভবঋদ্ধ মানুষ। 'অন্ধবধূ' কবিতায় দেখা যায়, অন্ধবধূ অন্তর্দৃষ্টি প্রসারিত করে পায়ের নিচে নরম বস্তুর অস্তিত্ব, কোকিলের ডাক শুনে নতুন ঋতুর আগমন, শ্যাওলায় পা পিছলে তলিয়ে যাওয়া দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জেগে ওঠার বিষয়গুলো বুঝতে পারে। দিঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগার বিষয়টি অনুমান করে অন্ধবধূ ঋতু পরিবর্তনের অনুমান করার পাশাপাশি পা পিছলে পড়ে যাওয়ার শঙ্কার বিষয়টিও অনুভব করেছে, যা তার অনুভূতির তীক্ষ্ণতার প্রমাণ।
উদ্দীপকের সাথে 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর ইন্দ্রিয়সচেতনতার অংশটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূ জানে, চোখ না থাকা মানেই সমাজে অবহেলা, উপহাস ও একাকিত্ব। তবুও সে দুর্বল নয়- অনুভূতি দিয়ে জীবন জিতে নেয়। মানুষ তাকে যতই অবহেলা করুক, সে প্রকৃতিকে ভালোবাসে। কবিতার এই বার্তা মানবিক ও দার্শনিক।
উদ্দীপকে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়ের ইন্দ্রিয়সচেতনতার কথা বলা হয়েছে। সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও ইন্দ্রিয়সচেতনতা দিয়ে তার এই প্রতিবন্ধিতা জয় করতে সক্ষম হয়েছে। ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শিখে সে শিক্ষকতা করছে। এই ভাবটির সাথে 'অন্ধবধূ' কবিতার একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বধূর ইন্দ্রিয়সচেতনতার দিকটি সাদৃশ্যপূর্ণ। কবিতার প্রথম অংশে দেখা যায়, বধূটি অনুভূতি শক্তির দ্বারা প্রকৃতির পরিবর্তন বুঝতে পারে। ফুলের গন্ধে সে সময়ের অনুভব করে। পায়ের নিচে নরম বস্তুর অস্তিত্ব, পাখির ডাকে ঋতু পরিবর্তন বুঝতে পারে। এভাবেই উদ্দীপকের সঙ্গে 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর ইন্দ্রিয়সচেতনতার অংশটি সাদৃশ্যপূর্ণ।
প্রকৃতির সঙ্গে অন্ধবধূর একাত্মতা ও মনোবেদনার দিকটির ভিত্তিতে বলা যায়, "উদ্দীপকের ফুলবানু এবং অন্ধবধূ চরিত্রের ভাব সম্পূর্ণ আলাদা"- মন্তব্যটি যথার্থ।
'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূ বুঝতে পারে বকুলফুল ঝরছে, কারণ ওই গন্ধ ও নরম স্পর্শ তার ইন্দ্রিয়কে জানান দেয়। যদিও চোখ নেই, প্রকৃতির সান্নিধ্যে সে আনন্দ খুঁজে পায়। রাতে সে ভাবে আকাশ-পাতাল, মধুর ঘ্রাণে তার মন ভরে ওঠে। কবি বোঝান- চোখ না থাকলেও অনুভূতি ও কল্পনা মানুষকে সৌন্দর্য দেখতে শেখায়।
উদ্দীপকের ফুলবানু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে সে জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। বাবার সহযোগিতায় সে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া শিখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। তার অদম্য ইচ্ছা ও চেষ্টার কাছে অন্ধত্বের অভিশাপ পরাজিত হয়। এই ফুলবানু এবং 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূ সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ অন্ধবধূ নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, প্রতিবন্ধিতাকে জয় করতে পারেনি।
'অন্ধবধূ' কবিতায় দেখা যায়, অন্ধবধূটি তার প্রখর অনুভূতি শক্তি দ্বারা জগৎ সংসারের সমস্ত কিছু অনুভব করতে পারে। তার জীবন সামাজিক নাগপাশে বাঁধা পড়ে আছে। সমাজে সে অবহেলিত ও অপাঙ্ক্তেয়। সে পরিবারে যোগ্য মর্যাদা পায় না। তার স্বামী তাকে অবহেলা করে প্রবাসে জীবন কাটায়। অন্ধত্বের অভিশাপের পাশাপাশি আত্মীয়-পরিজনদের কাছ থেকে অবহেলা পেয়ে জীবন তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। তবে সে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। সে অন্ধত্বকে জয় করতে পারেনি। অন্যদিকে উদ্দীপকের -ফুলবানু অন্ধত্বকে জয় করে স্বনির্ভর হতে পেরেছে। এ কারণেই বলা যায়, উদ্দীপকের ফুলবানু এবং অন্ধবধূর ভাব সম্পূর্ণ আলাদা।
