এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে
সবচেয়ে পুরাতন কথা,
সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন,
‘যেতে নাহি দিব’। হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
চলিতেছে এমনি অনাদিকাল হতে।
কবি মানবের মাঝে বাঁচতে চান।
কবি তাঁর সৃষ্টিতে জীবনের বিচিত্র অনুভব-অনুভূতি প্রাণময় করে তুলতে চেয়েছেন।
'প্রাণ' কবিতায় জনকল্যাণকর কাজের মাধ্যমে জগৎ-সংসারে দীর্ঘ জীবনলাভের সংকল্প ব্যক্ত হয়েছে। তিনি জগতের মায়া ছেড়ে অন্য কিছুর লোভে মৃত্যুপথের যাত্রী হতে চান না। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে নব নব সংগীতের কুসুম ফোটাতে চান। তিনি মানবের জীবন্ত হৃদয় মাঝে স্থান পেতে চান। তাঁর সৃষ্টিতে পৃথিবীর নর-নারীর সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন যদি ঠিকভাবে ঠাঁই পায়, তবেই তিনি অমর হবেন। মানুষের জীবনের বিচিত্র অনুভব-অনুভূতি, ভাব-ভাবনা ও কর্মের জগৎকে তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে এভাবে প্রাণময় করে তুলতে চান।
অনাদিকাল ধরে চলে যাওয়ার বাস্তব সত্যটিতে 'প্রাণ' কবিতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।
'প্রাণ' কবিতায় কবি মৃত্যুকে ভয় পান না, কিন্তু তিনি জীবনকে ভালোবাসেন। তিনি মরতে চান না কারণ জীবনের সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও মানবসম্পর্ক তাঁর কাছে অমূল্য। মৃত্যুর চেয়ে জীবনের সৃজনশীল আনন্দ তাঁর প্রিয়।
উদ্দীপকের কবিতাংশে বলা হয়েছে, এই পৃথিবীর স্বর্গ-মর্ত ছেয়ে থাকা সবচেয়ে পুরনো কথা, বিচ্ছেদের সবচেয়ে গভীর ক্রন্দন 'যেতে নাহি দিব। হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।' এখানে 'চলে যাওয়া' বলতে মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে। 'প্রাণ' কবিতায়ও চলে যাওয়ার প্রসঙ্গটি এসেছে। কবি এই সূর্যকর.. পুষ্পিত কানন ছেড়ে তাঁর চলে যাওয়ার কথা বলেছেন। অথচ তিনি মানবের মাঝে বেঁচে থাকতে চান। এ সুন্দর ভুবনে তিনি মরতে চান না। এভাবেই এখানকার মৃত্যুর প্রসঙ্গটিই উদ্দীপকের অনাদিকাল ধরে চলে যাওয়ার বাস্তব সত্যটিতে প্রকাশ পেয়েছে।
কর্মের মধ্য দিয়ে কবির অনন্তকাল বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার দিকটি থেকে বলা যায়, "অনন্ত চরাচরের এই অমোঘ সত্যকে ভূলুণ্ঠিত করে অমরত্ব লাভের প্রত্যাশায় কবি নব নব সংগীতের কুসুম ফোটাতে চান"- মন্তব্যটি যথাযথ।
'প্রাণ' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শিল্পীসত্তার অমরতার কথা বলেছেন। তাঁর ব্যক্তিসত্তা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হারিয়ে গেলেও তিনি চান, তাঁর গান, কবিতা, সৃষ্টি যেন মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে; যেন মানুষের কণ্ঠে তাঁর সৃষ্টি বারবার নতুনভাবে জন্ম নেয়। এজন্য তিনি নতুন নতুন সৃষ্টিতে মত্ত থাকেন।
উদ্দীপকের কবিতাংশে কবি অনাদিকাল ধরে চলে আসা সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। অমোঘ সত্য মৃত্যুকে মেনে সবাইকে চলে যেতে হয় একথা বলা হয়েছে। স্বর্গ-মর্ত ছেয়ে থাকা সবচেয়ে পুরনো কথা আর গভীর ক্রন্দন 'যেতে নাহি দিব'। তবুও চলে যেতে হয়। এই চলে যাওয়াকে 'প্রাণ' কবিতায় কবি মেনে নিতে চাননি। অনন্ত চরাচরের অমোঘ এই সত্যটি তিনি এড়িয়ে গিয়ে অমর হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন।
'প্রাণ' কবিতার কবি জানেন যে, পৃথিবীতে অনন্তকাল বেঁচে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি নব নব সংগীত-কুসুম ফোটাতে চেয়েছেন। তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তাঁর ধারণা এই সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তিনি অমর হবেন। তাই বলা যায় যে, "অনন্ত চরাচরের এই অমোঘ সত্যকে ভূলুণ্ঠিত করে অমরত্ব লাভের প্রত্যাশায় কবি নব নব সংগীত-কুসুম ফোটাতে চান।"- মন্তব্যটি যথার্থ।
