গফুর লজ্জিত হইয়া বলিল, বাপ বেটিতে দুবেলা দুটো পেটভরে খেতে পর্যন্ত পাইনে। ঘরের পানে চেয়ে দেখ, বিষ্টি বাদলে মেয়েটিকে নিয়ে কোপে বসে রাত কাটাই, পা ছড়িয়ে শোবার ঠাঁই মেলে না। মহেশকে একটিবার তাকিয়ে দেখ, পাঁজরা গোনা যাচ্ছে। দাওনা ঠাকুর মশাই কাহন-দুই ধার, গরুটাকে দুদিন পেটপুরে খেতে দিই। বলিতে বলিতেই গফুর ধপ করিয়া ব্রাহ্মণের পায়ের কাছে বসিয়া পড়িল। তর্করত্ন কহিলেন, ‘আ মর, ছুঁয়ে ফেলবি নাকি?’
গ্রামে ঈশ্বর নাপিত নাড়ি দেখতে জানত।
রসিক দুলের পায়ের ধুলা কারও কাছে এত মূল্যবান হতে পারে এ কথা ভেবে রসিক হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
কাঙালীর মা মৃত্যুশয্যায় তার স্বামীর পায়ের ধুলা নিতে চেয়েছে। তাই অভাগী সন্তান কাঙালীকে দিয়ে তাকে অন্য গ্রাম থেকে ডেকে পাঠায়। অভাগীর যখন আর জ্ঞান নেই তখন তার স্বামী রসিক সেখানে উপস্থিত হয়। অভাগীকে সারা জীবন সে অবজ্ঞা করেছে অথচ তার পায়ের ধুলার জন্য অভাগী তাকে স্মরণ করে। পৃথিবীতে তার পায়ের ধুলারও যে কারও প্রয়োজন আছে এ কথা তার কল্পনাতীত। তাই মৃত্যুপথযাত্রী অভাগীর অবশ হাত পায়ের ধুলা নিতে গেলে সে হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
বঞ্চিত ও অবহেলিত হওয়ার দিক থেকে উদ্দীপকের গফুর চরিত্রটি 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের বাঙালি চরিত্রের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
দরিদ্রের দুঃখ-কষ্ট, ক্রন্দন ধনীর কানে গিয়ে পৌঁছায় না। ধনীরা দরিদ্রদের অবহেলা করে দূরে সরিয়ে রাখে, তাদের বঞ্চিত করে। এতে দরিদ্রের যন্ত্রণা আরও বাড়ে এবং এই বঞ্চনা নিয়েই তাদের বেঁচে থাকতে হয়।
‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্পে কাঙালী সমুকে সমাজের অবহেলা ও নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে। মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বেলগাছ চাইতে গেলে জমিদারের লোকজন তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। আবার মুসলিম হওয়ার কারণে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের তর্করত্ন তাকে ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে দূরে সরিয়ে রাখে। এই দুঃখ, বঞ্চনা, সামাজিক অবহেলা ও অস্পৃশ্যতার যন্ত্রণা—সব মিলেই গফুর চরিত্রের সঙ্গে কাঙালী চরিত্রের গভীর সাদৃশ্য তৈরি করে।
নিষ্ঠুরতা এবং কূলপর্বে উদ্দীপকের তর্করত্ন 'অভাগীর ছা গল্পের অধর রায়ের সার্থক প্রতিনিধি।
এক সময় বাঙালি হিন্দু সমাজে জাতবৈষম্য প্রবল আকার ধারণ করেছিল। সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থায় উঁচু জাতের মানুষরা নীচ জাতের মানুষদের ঘৃণ্য করত। তারা তাদের স্পর্শকেও অপবিত্র মনে করত।
'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে এই অস্পৃশ্যতার চিত্র পাই গোমস্তা অঙ্গর রায়ের আচরণে। কাঙালী দুলের ছেলে বলে সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানটাতে গোবরজল ছিটিয়ে দিতে বলে সে। এখানেই শেষ নয়, দরিদ্র কাঙালী সামান্য একটা গাছ চাইতে এসে তাকে মার খেয়ে শূর হাতে ফিরতে হয়েছে। উদ্দীপকের গফুরও অস্পৃশ্যতার শিকার হয়েছে। ধনী ব্রাহ্মণ তর্করত্নের কাছে সামান্য খড় চেয়ে সে বার্থ হয়েছে। গফুরের দুঃখে তর্করত্নের হৃদয় গলেনি, বরং তার নিষ্ঠুরতাই এতে প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
তর্করত্ন এবং অধর রায় উভয়ই ধনী, নিষ্ঠুর এবং কুলগর্বে গর্বিত। এ কারণেই গফুর ও কাঙালীর মতো দরিদ্র-অসহায় মানুষেরা তাদের দ্বারা অবহেলিত-অত্যাচারিত হয়। এ দিক থেকে উদ্দীপকের তর্করত্ন 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের অধর রায়ের সার্থক প্রতিনিধি।
