হাশেম, সাহেবের একমাত্র মেয়ের বিয়ে। শৌখিন হাশেম সাহেব তাই সব ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের ছোঁয়া দেখতে চান। বিয়ের কার্ড থেকে বাসার সিঁড়ি-প্রতিটি ক্ষেত্র তিনি শিল্পের ছোঁয়ায় ভরিয়ে তোলেন। কাঁচা ফুলের সমারোহে ভরিয়ে তোলেন প্রতিটি স্থান। আলপনায় ভরে ওঠে প্রতিটি মেঝে। ‘বরপক্ষ অনেক খুশি হাশেম সাহেবের এই সৌন্দর্যবোধ দেখে। সবার মাঝে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না হাশেম সাহেবের মেয়ের বিয়েতে।
'ফুলের বিবাহ' গল্পটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থের অন্তর্গত।
কন্যাকর্তা কন্যা সম্প্রদান করিলেন- বাক্যটি দ্বারা অভিভাবক হিসেবে মল্লিকাবৃক্ষ গোলাবের হাতে মল্লিকা-কলিকে সম্প্রদান করাকে বোঝানো হয়েছে।
'ফুলের বিবাহ' গল্পের লেখক নসীবাবুর বাগানে দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়ে মল্লিকা-কলির সাথে গোলাবের বিয়ের লঘু বিষয়কে উপস্থাপন করেছেন। মানবসমাজের প্রচলিত বিবাহ অনুষ্ঠানের অনুরূপ কল্পনায় উদ্ভাসিত হয়েছে রচনাটি। এখানে মল্লিকাবৃক্ষ কন্যাভারগ্রস্ত পিতা। গোলাবের বংশীয় গৌরবে মুগ্ধ হয়ে ঘটকরাজ ভ্রমরের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে মল্লিকাবৃক্ষ তার পরিপুষ্ট কলিকে গোলাবের হাতে সম্প্রদান করে। আলোচ্য বাক্যটি দ্বারা এ বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকের হাশেম সাহেবের মনোভাবের সঙ্গে 'ফুলের বিবাহ' গল্পের মল্লিকা ফুলের বিয়ের সাজসজ্জা ও আড়ম্বরতায় মিল রয়েছে।
'ফুলের বিবাহ' গল্পে প্রকৃতির সৌন্দর্যের কথা উঠে এসেছে। প্রকৃতিতে বিরাজমান অসংখ্য ফুলের সমারোহ প্রকৃতিকে সাজিয়ে তোলে অপরূপ সজ্জায়। প্রকৃতির নিপুণ শিল্পকর্মে বিমোহিত হয়ে ওঠে মানুষ।
'ফুলের বিবাহ' গল্পে মল্লিকা-কলির বিয়ের দিন বাগানের যাবতীয় ফুল ও কীটপতঙ্গ সেজেছে নতুন রূপে। মৌমাছি সানাই বাজিয়ে, জোনাকিরা ঝাড় জ্বালিয়ে আকাশে তারাবাজি করতে লাগল। জবাগোষ্ঠী, করবী দল, চাঁপা, গন্ধরাজ, অশোক প্রভৃতি ফুল সেজে দুলতে লাগল। যূথী, মালতী, বকুল, রজনিগন্ধা পাতায় পাতায় জড়াজড়ি করে গন্ধ ছড়িয়ে রূপের ভারে ভেঙে পড়েছে। উদ্দীপকের হাশেম সাহেব তার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে সাজসজ্জার মধ্য দিয়ে সৌন্দর্যবোধের পরিচয় দিয়েছে। বিয়ের কার্ড থেকে বাসার সিঁড়ি-প্রতিটি ক্ষেত্র শিল্পের ছোঁয়ায় ভরিয়ে তুলেছেন। কাঁচা ফুল ও আলপনায় ভরে উঠেছে প্রতিটি স্থান। হাশেম সাহেবের মেয়ের বিয়ের সাজসজ্জার বিষয়টির সাথে 'ফুলের বিবাহ' রচনার মল্লিকা-কলির বিয়ের সাজসজ্জা ও আড়ম্বরতায় সাদৃশ্য রয়েছে।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য মানবহৃদয়ে উজ্জীবিত করার দিক থেকে "উদ্দীপকের হাশেম সাহেবের সৌন্দর্যবোধ 'ফুলের বিবাহ' গল্পের ভাবধারাকে আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলে" মন্তব্যটি যথার্থ।
'ফুলের বিবাহ' গল্পটি হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানবজীবনের এক প্রতীকী রূপ। এখানে বঙ্কিমচন্দ্র প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন, যার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে মানুষের বিচিত্র সৌন্দর্যবোধের কথা।
'ফুলের বিবাহ' গল্পটি লেখকের সৌন্দর্যবোধেরই পরিচায়ক। লেখক এখানে ফুলের বিবাহকে মানবসমাজে প্রচলিত বিবাহের অনুরূপ ব্যঞ্জনা প্রদান করেছেন। বিবাহের উদ্যোগ, সাজসজ্জা, মধ্যস্থতাকারী, পাত্র-পাত্রী সবই লেখকের কল্পিত সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধের প্রতিমূর্তি। নসীবাবুর বাগানে বসে লেখক ফুল-পতঙ্গের মধ্যে সেই সৌন্দর্যবোধকেই দেখতে পেয়েছিলেন, যা মানবসমাজের আড়ালে থেকে যায়। উদ্দীপকের হাশেম সাহেবের মাঝেও সৌন্দর্যবোধের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তার একমাত্র মেয়ের বিয়েতে সবকিছুতে তিনি নান্দনিকতার ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
. উদ্দীপকের হাশেম সাহেবের সৌন্দর্যবোধ 'ফুলের বিবাহ' গল্পের লেখকের সৌন্দর্যবোধেরই পরিচায়ক। নসীবাবুর বাগানে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে লেখক সেই সৌন্দর্যের পরিচয় পেয়েছেন। ফুল নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যের প্রতীক। লেখক ফুলের মধ্য দিয়েই নিজের সৌন্দর্যচেতনা ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনব কৌশলে। ফুল-পতঙ্গকে লেখক মানবীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে সমাজের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকের হাশেম সাহেবের সৌন্দর্যবোধ 'ফুলের বিবাহ' গল্পের ভাবধারাকেই আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলে।
