জাতীয় জীবনধারা গঙ্গা-যমুনার মতোই দুই ধারায় প্রবাহিত। এক ধারার নাম আত্মরক্ষা বা স্বার্থ প্রসার, আরেক ধারার নাম আত্মপ্রকাশ বা পরমার্থ বৃদ্ধি। একদিকে যুদ্ধবিগ্রহ, মামলা ফ্যাসাদ প্রভৃতি কদর্য দিক; অপরদিকে সাহিত্য শিল্প, ধর্ম প্রভৃতি কল্যাণপ্রদ দিক। একদিকে শুধু কাজের জন্য কাজ। অপরদিকে আনন্দের জন্য কাজ। একদিকে সংগ্রহ, আরেকদিকে সৃষ্টি। যে জাতি দ্বিতীয় দিকটির প্রতি উদাসীন থেকে শুধু প্রথম দিকটির সাধনা করে, সে জাতি কখনো উঁচু জীবনের অধিকারী হতে পারে না।
'বই পড়া' প্রবন্ধটি একটি লাইব্রেরির বার্ষিক সভায় পঠিত হয়েছিল।
সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারণ সাহিত্যের মধ্যেই পুরো মনটার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক সাহিত্যচর্চাকে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ বলেছেন। কারণ সাহিত্য মানুষের মনকে সরল, সরাগ ও সমৃদ্ধ করে তোলে। সাহিত্যের জন্ম হয়েছে দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মনীতি, অনুরাগ-বিরাগ, আশা-নৈরাশ্য প্রভৃতির সমবায়ে। মূলত অন্যান্য শাস্ত্রে যা আছে তা মনের ভগ্নাংশ কেবল, পুরো মনের সাক্ষাৎ সাহিত্যেই পাওয়া যায়। তাই লেখক সাহিত্যচর্চাকে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ বলেছেন।
উদ্দীপকে বর্ণিত দ্বিতীয় দিকটি 'বই পড়া' প্রবন্ধের যে দিকটিকে ইঙ্গিত করে তা হচ্ছে শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের মনকে প্রসারিত করার দিকটি।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক মানসিক সুস্থতার জন্য হাসপাতালের চেয়ে লাইব্রেরির গুরুত্ব বেশি বলে লাইব্রেরিকে হাসপাতালের ওপরে স্থান দিয়েছেন। কেননা, শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে মানসিক অসুস্থতা বেশি ভয়াবহ। মানসিক সুস্থতার জন্য লাইব্রেরিই অন্যতম জায়গা। সেখানে স্বেচ্ছায় বই পড়ে মানুষ তার মনের সুস্থতা পেতে পারে, মনকে আনন্দিত করতে পারে এবং মনের প্রসার ঘটাতে পারে।
উদ্দীপকে মানবজীবনের দুটি ধারার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একটি হচ্ছে আত্মরক্ষা বা স্বার্থ প্রসার এবং অন্যটি হচ্ছে আত্মপ্রকাশ বা পরমার্থ বৃদ্ধি। যার এক দিকে যুদ্ধবিগ্রহ, মামলা ফ্যাসাদ প্রভৃতি নেতিবাচকতা এবং অন্যদিকে সাহিত্য-শিল্প-ধর্ম প্রভৃতি কল্যাণময় দিক। এই দ্বিতীয় দিকটি মানুষের জীবনকে মহৎ ও সার্থক করে তোলে। 'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক এই দ্বিতীয় দিকটির গুরুত্বের কথাই তুলে ধরেছেন। কেননা শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের মনের প্রসার ঘটাতে পারে যা মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা অর্জনে সহায়ক। এই দ্বিতীয় দিকটি মানুষকে তার ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ থেকে বের করে স্বপ্রণোদিতভাবে আনন্দের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং মানুষকে জীবনের উচ্চতম স্থানে নিয়ে যায়। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে বর্ণিত দ্বিতীয় দিকটি 'বই পড়া' প্রবন্ধের মানুষের মনের প্রসারের দিকটিকে ইঙ্গিত করে।
বক্তব্য বিষয়ের দিক থেকে বলা যায়, "উদ্দীপকের বিষয়বস্তু 'বই পড়া' প্রবন্ধের অংশবিশেষের বর্ণনা মাত্র”- মন্তব্যটি যথার্থ।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে ভিতর থেকে মানুষ করে তোলা। যে মানুষ স্কুল-কলেজের শুধু শিক্ষায় নয়, বরং স্বীয় অনুসন্ধিৎসা ও আত্মজ্ঞানের নানা বিষয়ে অবগাহন করেছেন তিনি সুশিক্ষিত। প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্ব অর্জন করে সমাজের কল্যাণ সাধন করে থাকেন। এ কারণেই সুশিক্ষিত লোককেই লেখক সুশিক্ষিত বলেছেন।
উদ্দীপকের ঘটনাংশে দেখা যায়, মানুষের জীবনধারার দুটি প্রবাহ যথা- ইতিবাচক ও নেতিবাচকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে বিভোর থাকে এবং কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে চায় তখন তার নেতিবাচক দিকটি প্রকাশ পায়। - অপরদিকে মানুষ যখন সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম প্রভৃতি কল্যাণময় কাজের মধ্য দিয়ে আনন্দ অনুভব করে তখন তার মধ্যে সৃষ্টি হয় ইতিবাচক - মানসিকতার। এই ইতিবাচক মানসিকতায় একটি জাতিকে উন্নত করে তোলে। উদ্দীপকের এসব বিষয়বস্তু 'বই পড়া' প্রবন্ধের আংশিক বিষয়কে ধারণ করতে পেরেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধেও উদ্দীপকের এই মানবজীবনের দুটি ধারা সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন লেখক। কিন্তু প্রবন্ধের মূলভাব আরো বেশি বিস্তৃত। লেখক আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিকে তুলে ধরে মনের চিকিৎসা করার জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা এই লাইব্রেরিতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের মর্জি অনুযায়ী বই পড়তে পারে এবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে। মানুষের মধ্যকার নেতিবাচক দিকটি দূর করতে লেখক অধিক পরিমাণে বই পড়ার অভ্যাস গড়তে বলেছেন। কেননা জাতির মানসিক বিকাশকে সমৃদ্ধ করতে বই পড়া, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই। তাই বলা যায়, "উদ্দীপকের বিষয়বস্তু 'বই পড়া' প্রবন্ধের অংশবিশেষের বর্ণনা মাত্র।"
