যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না, এজন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করিত। সে যে বিধাতার অভিশাপম্বরূপ তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে একথা সে শিশুকাল হইতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত। মনে করিত, “আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি।”
পায়ের তলায় নরম ঠেকেছিল ঝরা বকুল ফুল।
"জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ!" লাইনটির মাধ্যমে অন্ধবধূর নৈরাশ্য এবং জীবনের প্রতি অনীহার স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে।
অন্ধবধূ অনুভবঋদ্ধ মানুষ। আত্মমর্যাদাবোধে সে সমৃদ্ধ। কিন্তু তার অন্ধত্বের কষ্ট তাকে গভীরভাবে আহত করে। দিঘির ঘাটে যখন শ্যাওলাপড়া পিছল সিঁড়ি জাগে তখন সে পা পিছলে জলে পড়ে ডুবে মরার আশঙ্কা প্রকাশ করে। আবার এও অনুভব করে যে, ডুবে মরলে তার অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচত। আবার অন্ধবধূ দৃষ্টিহীন বলে তার কাঁদতেও মানা। মূলত প্রশ্নোক্ত লাইনটির মধ্য দিয়ে অন্ধবধূর নৈরাশ্যের প্রকাশ ঘটেছে।
উদ্দীপকটি 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর নৈরাশ্যের দিকটিকে আলোকপাত করেছে।
'অন্ধবধূ' কবিতায় চোখ না থাকায়- লোকেরা তার যন্ত্রণা গুরুত্ব দেয় না। এই অংশে বোঝা যায়, প্রতিবন্ধী মানুষ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক অবহেলা ও সামাজিক অবজ্ঞার শিকারও হয়। ফলে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারা মুক্তি পেতে চায়।
'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূ অন্ধত্বের কারণে হীনম্মন্যতার শিকার। স্বামীর প্রবাস জীবনযাপনের কারণ হিসেবেও দায়ী করে নিজের অন্ধত্বকে। সে অনুভূতি দিয়ে প্রকৃতিকে বুঝতে চায়, আর ভুলে থাকতে চায় নিজের সংসার ও বন্ধ গৃহকোণকে। উদ্দীপকটিতে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধীর আশাহীন জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে। উদ্দীপকের বোবা চরিত্রটি নিজেকে বিধাতার অভিশাপস্বরূপ মনে করত। সেও সব সময় নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখত। আর ভাবত তাকে যেন সবাই ভুলে যায়। নিজের প্রতিবন্ধিতার জন্যই তার মনে এ রকম হতাশা আর হীনম্মন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। এভাবেই 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর নিজের প্রতিবন্ধিতা নিয়ে হতাশায় মুষড়ে পড়ার বিশেষ দিকটিই উদ্দীপকে প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকে প্রকৃতির সঙ্গে অন্ধবধূর অন্তরঙ্গতার দিকটি না থাকায় বলা যায়, উদ্দীপকটিতে 'অন্ধবধূ' কবিতার সমগ্র ভাবের প্রতিফলন ঘটেনি।
'অন্ধবধূ' কবিতায় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা স্পষ্ট। দৃষ্টিহীন জীবন তাকে ভয় পাইয়ে দেয়- বিয়ের পর নিজের ঘরে আসার পথও খুঁজে পাবে না। সে জানে, পরিবার ও স্বামী তাকে অবহেলা করতে পারে। এ কবিতায় শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবনের অনিশ্চয়তা বাস্তবে ধরা পড়ে। তবে প্রকৃতির মধ্য বিচরণ করে আনন্দ পায়, দুঃখ ভুলতে চায়।
উদ্দীপকে এক বাষ্প্রতিবন্ধীর মনোজাগতিক ও বাহ্যিক জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায়। বোবা চরিত্রটি নিজেকে বিধাতার অভিশাপ মনে করে। সে নিজেকে সব সময় অন্যদের থেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করে। উদ্দীপকের এ ভাবটি 'অন্ধবধূ' কবিতায় প্রকাশিত ভাবসমূহের একটি। এটি আলোচ্য কবিতার সমগ্র ভাব নয়।
'অন্ধবধূ' কবিতায় কবি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক বধূর মনোজাগতিক অবস্থা, তার সামাজিক ও পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতার দিকটি তুলে ধরেছেন। তার ইন্দ্রিয়সচেতনতা, অনুভূতি, অভিমান ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। প্রকৃতির পরিবর্তন, প্রকৃতিতে পাখ ডাকা, ফুল-ফলের গন্ধ ইত্যাদির প্রতি সে সচেতন। প্রকৃতি ছেড়ে ঘরে যেতে চায় না। এছাড়াও প্রকৃতিকে নিয়ে অন্ধবধূর যে ইন্দ্রিয়সচেতনতার বিষয় কবিতায় ফুটে উঠেছে সেই বিষয়েও কোনো ইঙ্গিত উদ্দীপকে নেই। তাই বলা যায়, উদ্দীপকটি 'অন্ধবধূ' কবিতার সামগ্রিক ভাব ধারণ করেনি।
