(ক) জীবনেরে কে রাখিতে পারে।
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
(খ) চলে যাব- তবু যতক্ষণ এ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
'প্রাণ' কবিতায় কবি পুষ্পিত কাননে জীবন্ত হৃদয়ে স্থান পেতে চান।
কবি তাঁর সৃষ্টিশীল সৎ ও শুভ কর্মের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার দৃঢ় সংকল্প করেছেন।
কবি বিশ্বাস করেন, শারীরিকভাবে তিনি ক্ষণস্থায়ী হলেও তাঁর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি গান, কবিতা ও সাহিত্য সৃষ্টি করে মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘকাল ধরে বাস করতে চান। তাই তিনি সৃষ্টি করতে চান নতুন নতুন মহৎকর্ম, যা মানুষের হৃদয়ে আপনা হতে স্থান করে নিতে পারবে। তিনি বলেন, তিনি যদি অমর কীর্তি গড়ে তুলতে না পারেন, তবে অন্তত মানুষের মাঝে থেকেই নতুন নতুন সংগীত সৃষ্টি করবেন, যা তাকে চিরঞ্জীব করে রাখবে।
উদ্দীপকের 'ক' অংশ 'প্রাণ' কবিতার জীবন-মৃত্যু, মানবসমাজে অস্তিত্ব এবং সৃষ্টিশীলতার আকাঙ্ক্ষার দিকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
'প্রাণ' কবিতায় কবি জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সৃষ্টিশক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি মরতে চান না, কারণ মানবসমাজ, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের মধ্যেই তিনি জীবন খুঁজে পান। তিনি চান মানুষের সুখ-দুঃখে, হাসি-কান্নায়-মিশে থেকে এমন অমর গান রচনা করতে, যা মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত থাকবে।
'প্রাণ' কবিতায় বলা হয়েছে- 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।' কবি এখানে সরাসরি বলে দিয়েছেন যে তিনি মরতে চান না, বরং মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চান। উদ্দীপকের 'ক' কবিতাংশে প্রতীকীভাবে বোঝানো হয়েছে যে কেউ চিরকাল জীবিত থাকতে পারে না, সকলেই একদিন আকাশের তারার মতো মিলিয়ে যায়। অথচ 'প্রাণ' কবিতায় বলা হয়েছে- 'মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই', অর্থাৎ কবি চান, তাঁর সৃষ্টি বা কর্ম মানুষের মাঝে অমর হয়ে থাকুক। তিনি আরও বলেন, 'যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়', যা বোঝায় সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে দীর্ঘকাল টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষা। এভাবে উভয় কবিতায়ই মৃত্যুর বাস্তবতাকে স্বীকার করার বিষয়টি সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সৎ ও শুভকর্মের মাধ্যমে মানবের মাঝে বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রতিফলিত হওয়ায় "উদ্দীপকের 'খ' অংশ যেন 'প্রাণ' কবিতার কবির আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপ"- মন্তব্যটি যথার্থ।
'প্রাণ' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে নয়, জীবনের সৌন্দর্য ও মানবতার চেতনা উদ্যাপন করেছেন। তিনি মানবজীবনের আনন্দ, প্রেম ও সৃষ্টিকে চিরন্তন মনে করেন। কবি চান তাঁর জীবনের মাধ্যমে মানবহৃদয়ে নতুন সংগীত ফুটে উঠুক, যাতে তিনি সৃষ্টির মধ্য দিয়েই অমর হয়ে থাকেন।
উদ্দীপকের 'খ' কবিতাংশে কবি ঘোষণা করেন যে, তিনি যতক্ষণ বেঁচে থাকবেন, ততক্ষণ পৃথিবীর জঞ্জাল সরিয়ে জীবনকে সুন্দর করে তুলতে চান। এখানে কর্ম, সাধনা ও দায়িত্ববোধের প্রতি এক অঙ্গীকার প্রকাশিত হয়েছে। মৃত্যু অনিবার্য হলেও তার আগ পর্যন্ত মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই কবির লক্ষ্য। পৃথিবীর জন্য কাজ করে যাওয়ার এবং পৃথিবী থেকে সকল নেতিবাচকতা দূর করার এ আকাঙ্ক্ষাই কবি ব্যক্ত করেছেন 'প্রাণ' কবিতার মধ্যে। 'প্রাণ' কবিতায় কবি জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। এখানে তিনি মৃত্যুকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতিতে ও সৃষ্টিতে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
'প্রাণ' কবিতার কবি চান তাঁর সৃষ্টিকর্ম মানুষের মনে অমর হয়ে থাকুক আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত মানুষের ভালোবাসায়, তাদের হৃদয়ে তিনি ঠাঁই পান। উদ্দীপকের 'খ' কবিতাংশে 'প্রাণ' কবিতার কবির প্রত্যাশা প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে। এদিক থেকে প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
