কতই বা বয়স তখন বিথীর? আট বা দশ। স্কুলে যাওয়ার পথে ট্রাকের ধাক্কায় রিকশা থেকে মা ছিট্কে পড়লেন। তারপর আর কিছু মনে নেই। এরপর নতুন মা-ই তার সব। বাবার এনে দেওয়া নতুন মা তার সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছেন। পরম যত্নে তাকে লালন-পালন করে আগলে রেখেছেন। আজ বিথীর এসএসসি পরীক্ষা। দাদির কড়া নির্দেশ বাসায় কারও খাবারের পাতে যেন ডিম না থাকে। বিথীর পরীক্ষা ভালো হবে এই কামনা করে তেলপড়া, পানিপড়া এনেছেন- বলে রেখেছেন পরীক্ষা শেষে নাতনির বিয়ে দেবেন। কিন্তু বিথীর নতুন মায়ের ঘোর আপত্তি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “মেয়ের আমার পড়াশোনা শেষ হবে; সমাজের একজন হয়ে উঠবে- তবেই বিয়ে।”
বহিপীরের মতে, কথ্য ভাষা হলো মাঠের ভাষা।
তাহেরাকে ভর্ৎসনা করতে খোদেজা তাহেরার উক্তিটি করেন।
বহিপীরের সাথে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ায় তাহেরা পালিয়েছিল। সে জানত না কোথায় পালাবে, শুধু জানত বাড়ি ছেড়ে তাকে পালাতে হবে। এই দুঃসাহস তার আশ্রয়দাতা খোদেজাকে আশ্চর্যান্বিত করে। মেয়ে মানুষ হয়েও ভয়হীনভাবে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল বলে খোদেজা তাহেরাকে 'শাবাশ মেয়ে তুমি' বলে ভর্ৎসনা করেছেন।
উদ্দীপকের দাদির মধ্যে জমিদার পত্নী খোদেজা এবং তাহেরার বাবা-মায়ের পশ্চাদপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের দিকটি লক্ষণীয়।
‘বহিপীর’ নাটকের খোদেজা এবং তাহেরার বাবা-মা ধর্মভীরু ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের অধিকারী। এ কারণে তাহেরার বাবা-মা পীরের সন্তুষ্টির মধ্যেই নিজেদের পারমার্থিক কল্যাণ নিহিত বলে মনে করে। ফলে মেয়ে তাহেরার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে বৃদ্ধ পীরকে খুশি করতে তারা সেই পীরের সঙ্গে তাহেরার বিয়ে দিতে চায়।
উদ্দীপকের দাদি পশ্চাদপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন একজন মানুষ। এ কারণেই তিনি পরীক্ষার দিন ডিম না খাওয়াসহ ঝাঁড়ফুঁকে বিশ্বাস করেন। শুধু তাই নয়, নাতনি বিথীর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে কিশোরী বয়সেই তিনি তাকে বিয়ে দিতে চান। একইভাবে, ‘বহিপীর’ নাটকের তাহেরার বাবা-মাও বৃদ্ধ পীরের সন্তুষ্টির কথা ভেবে তার সাথে নিজেদের অল্পবয়েসি মেয়ের বিয়ে দিতে চান। এমনকি জমিদার পত্নী খোদেজাও তাহেরাকে পীরের সঙ্গে সংসার করার কথা বলেন। অজ্ঞতা এবং কুসংস্কারই তাদের এমন মনোভাবের কারণ। সেদিক বিবেচনায়, উদ্দীপকের দাদির মধ্যে জমিদার পত্নী খোদেজা এবং তাহেরার বাবা-মায়ের পশ্চাদপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের দিকটিই লক্ষ করা যায়।
‘তাহেরার সৎ মা বিথীর নতুন মায়ের ভূমিকায় থাকলে তাহেরাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না।’- মন্তব্যটি যথাযথ বলেই আমি মনে করি।
‘বহিপীর’ নাটকের তাহেরার বাবা-মা পশ্চাৎপদ মানসিকতার অধিকারী। ধর্মের প্রকৃত অর্থকে বুঝতে না পেরে তারা পীরকেই নিজেদের কান্ডারী বলে মনে করে। আর তাই বৃদ্ধ পীরকে খুশি করতে তাহেরার ভবিষ্যতের কথা না ভেবে তারা সেই পীরের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করে। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাহেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
উদ্দীপকে বিথী নামের এক কিশোরীর কথা বলা হয়েছে। আট-দশ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় সে তার মাকে হারায়। এরপর তার বাবা পুনরায় বিয়ে করে। তবে সৎ মা বিথীর সাথে খারাপ আচরণ না করে তাকে কাছে টেনে নেয় এবং নিজের মেয়ের মতোই স্নেহাদরে তাকে মানুষ করতে থাকে। শুধু তাই নয়, এসএসসি পরীক্ষার পর বিথীর দাদি তাকে বিয়ে দিতে চাইলে তার সেই মা তাতে বাধ সাধে এবং পড়াশোনা শেষ করিয়ে তাকে সুমানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
‘বহিপীর’ নাটকের তাহেরা মাতৃহীন এক কিশোরী। সৎ মা তাকে বোঝা মনে করে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চায়। এ কারণেই বৃদ্ধ পীরের সাথে সে তাহেরার বিয়ে ঠিক করে। এক্ষেত্রে সে তাহেরার ভবিষ্যতের কথা পর্যন্ত চিন্তা করেনি। ফলে অসম ও অযাচিত এই বিয়ের হাত থেকে বাঁচতে তাহেরাকে পালিয়ে যেতে হয়। পক্ষান্তরে, বিথীর সৎ মা বিথীকে সন্তানস্নেহে কাছে টেনে নিয়েছে। তাকে আদর-যত্নে বড়ো করেছে। শুধু তাই নয়, মেয়ের উজ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাহেরার সৎ মায়ের মানসিকতা এমন উদার হলে তাহেরাও জীবনে উন্নতি করতে পারত এবং তাকে এমন বিড়ম্বনায়ও পড়তে হতো না। সেদিক বিবেচনায় প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথাযথ।
