মিসেস তামিমা মেয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বই ছাড়া অন্য কোনো বই পড়া সময় আর অর্থের অপচয় মনে করেন। মেয়ের হাতে কোনো গল্প-উপন্যাস দেখলেই ঘোর আপত্তি তার। তিনি মনে করেন- ভালো প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল, এরপর ভালো চাকরি- এই তো জীবন। কিন্তু স্বামী হাবীব রহমান স্ত্রীর এই ধারণার ঘোর বিরোধী- আর তাই তো মেয়ের জন্য অপ্রাতিষ্ঠানিক বই বিশেষ করে জীবনী, গল্প-উপন্যাস-এইসব কিনে দেওয়াতে কখনো আপত্তি করেন না। তিনি বলেন- মনের বিকাশের জন্য, আলোকিত হওয়ার জন্য সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।
শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ হলো সাহিত্যচর্চা।
আমাদের দেশে স্কুল-কলেজের ভুল শিক্ষাপদ্ধতি কীভাবে ছাত্রদের শিক্ষার ব্যাপারে নিস্পৃহ করে রাখে সেই প্রসঙ্গেই উক্তিটি করা হয়েছে।
দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে মানুষ। মানুষের মৃত্যু হয় একই সঙ্গে দৈহিক ও আত্মিক। দৈহিক মৃত্যুটা সবার দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু দৈহিকভাবে বেঁচে থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির আত্মিক মৃত্যু ঘটে। এই আত্মিক মৃত্যুর কথা কেউ ভাবেও না, জানেও না। এ দেশে ভুল শিক্ষাপদ্ধতির কারণে কত ছেলের যে শিক্ষা সম্পর্কে ভীতি ও অনীহা সৃষ্টি হয় সেটির হিসাব কেউ রাখে না। ফলে প্রাণস্ফূর্তি নিয়ে বেড়ে ওঠার পরিবর্তে ভীতি ও অপ্রাপ্তির পিছনে ছুটতে ছুটতে তার আত্মার মৃত্যু ঘটে। শিক্ষার্থীর 'এই আত্মিক মৃত্যুর প্রসঙ্গেই প্রাবন্ধিক বলেছেন, 'দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার হয় না।'
উদ্দীপকের মিসেস তামিমার মধ্যে 'বই পড়া' প্রবন্ধের শিক্ষার ফল লাভের দিক তথা নগদ বাজার দরের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধের লেখকের মতে সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। যে মানুষ স্কুল-কলেজের শিক্ষাই শুধু নয়, নিজ অনুসন্ধিৎসা ও আগ্রহে জ্ঞানের নানা বিষয়ে অবগাহন করেন তিনি সুশিক্ষিত। এই শিক্ষা নিজে নিজে অর্জন করতে হয়। যারা শিক্ষার দ্বারা আর্থিক লাভের কথা ভাবেন তারা প্রকৃত শিক্ষিত নন। তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের জাগরণে সুশিক্ষা নেই। এ কারণে অনেকেই প্রকৃত শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে এবং অর্থলাভের উপায়কেই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করে। তারা জ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চাকে গ্রহণ না করে বর্জন করে। বই কেনা এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে নিরর্থক মনে করে। কারণ তাদের যুক্তিতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্থ লাভ, জ্ঞান লাভ নয়।
উদ্দীপকের মিসেস তামিমা মেয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বই ছাড়া অন্য কোনো বই পড়াকে সময় আর অর্থের অপচয় মনে করেন। মেয়ের হাতে কোনো গল্প-উপন্যাস দেখলেই ঘোর আপত্তি তার। তিনি মনে করেন ভালো প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল, এরপর ভালো চাকরি পাওয়া-এটাই জীবনের সফলতা। 'বই পড়া' প্রবন্ধে এ ধরনের মানুষ সম্পর্কে লেখক বলেছেন যে তারা মহাভ্রান্তির মধ্যে আছে। তিনি বলেন, যে আমাদের শিক্ষিত সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা অর্থের উপর লোলুপদৃষ্টি দেয়। সাহিত্যচর্চার সুফল সম্পর্কে তারা সন্দিহান। তারা মনে করে সাহিত্যচর্চায় কোনো লাভ নেই। লেখক মনে করেন, তাদের এই ধারণা মূলত মহাভ্রান্তি। উদ্দীপকের মিসেস তামিমার মধ্যেও ঠিক এই দিকটিই ফুটে উঠেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখকের যুক্তিতে বই পড়ার যে গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে উদ্দীপকের হাবীব রহমানের কথায় 'বই পড়া' প্রবন্ধের মূল চেতনারই যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে" মন্তব্যটি যৌক্তিক।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন- পই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তিনি বলেছেন, সাহিত্যচর্চা যে শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লোকে যে সন্দেহ করে, তার কারণ এ শিক্ষার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না, অর্থাৎ তার কোনো নগদ বাজারদর নেই। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতরা অর্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। প্রকৃত শিক্ষা ও শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ বলে অর্থকেই জীবনের একমাত্র বিষয় মনে করে। অর্থকরী নয় এমন সবকিছুকেই তারা অনর্থক বলে বিবেচনা করে। তারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরের প্রকৃত শিক্ষাকে অর্থ ও সময়ের অপচয় মনে করে।
উদ্দীপকের মিসেস তামিমা মনে করেন প্রাতিষ্ঠানিক বইয়ের বাইরে অন্য কোনো বই পড়া সময় ও অর্থের অপচয় মাত্র। কিন্তু তার স্বামী হাবীব রহমান স্ত্রীর এই ধারণার ঘোর বিরোধী। তিনি তার মেয়ের জন্য জীবনী, গল্প, উপন্যাস এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক বই কিনে দেওয়াতে কখনো আপত্তি করেন না। তিনি বলেন- মনের বিকাশের জন্য, আলোকিত হওয়ার জন্য সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।
আলোচ্য প্রবন্ধটিতে লেখক আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি, অসংগতি, অপূর্ণতা, অতীতের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব, বই পড়ার গুরুত্ব ইত্যাদি দিক তুলে ধরেছেন। 'বই পড়া' প্রবন্ধের সারকথা হচ্ছে বই পড়ে এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে জীবনকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে তোলা। উদ্দীপকের হাবীব রহমানের বক্তব্যে এই চেতনাই প্রতিফলিত হয়েছে। তাই বলা যায়, প্রশ্নে প্রদত্ত মন্তব্যটি যৌক্তিক।
