মোহিনীদেবী আর শৈলবালা দুই বান্ধবী। দুজনের ছেলেই এবার পঞ্চম শ্রেণিতে। মোহিনীদেবী এ বয়সেই তার ছেলে অমিতকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে ফেলতে চান। খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ বাদ দিয়ে সব সময় লেখাপড়ার চাপে রাখেন। এতে অমিত মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অপরদিকে শৈলবালা মোহিনীদেবীর বিপরীত। ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেন না। পাঠ্যবইয়ের বাইরে ছেলে যে বই পড়তে ভালোবাসে লাইব্রেরি থেকে এনে পড়তে দেন। এতে পড়ালেখার প্রতি ছেলের আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং সে মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
'কারদানি' শব্দের অর্থ বাহাদুরি।
ইংরেজি সভ্যতার সংস্পর্শে এসেও আমরা ডেমোক্রেসিকে আয়ত্ত করেছি তার দোষগুলোকে আত্মসাৎ করে।
সাহিত্যচর্চা শিক্ষার সর্বপ্রধান অঙ্গ হলেও লোকে তা সন্দেহ করে। কেননা সাহিত্যচর্চার ফল হাতে হাতে পাওয়া যায় না। আমরা শিক্ষার বৈষয়িক ফল লাভে আগ্রহী। আমাদের দেশে ডেমোক্রেসি শুধু অর্থের সার্থকতা বোঝে। ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের যারা সূত্রপাত করেন তারা সব মানুষকে সমান করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এই সাম্যের ব্যাপারটির প্রতিফলন না করে গণতন্ত্র চর্চার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলের বড়লোক হওয়ার ইচ্ছায়, যা সমাজের জন্য, সাহিত্যের জন্য ক্ষতির কারণ। গণতন্ত্রের মহৎ গুণাবলি থাকলেও সেগুলো বর্জন করে মন্দ দিকগুলোকে আয়ত্ত করা হয়েছে। সুসভ্য ইংরেজ জাতির সংস্পর্শে এসে তাদের গুণাবলি আমরা চর্চা করি না, বরং নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতিই যেন আমাদের বেশি আকর্ষণ।
উদ্দীপকের মোহিনীদেবীর কর্মকাণ্ডে 'বই পড়া' প্রবন্ধের জোর করে বিদ্যা গেলানোর বিষয়টির ছায়াপাত ঘটেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক স্কুল-কলেজের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেছেন, পাশ করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়। তার মতে যে শিক্ষা শিক্ষার্থীকে মানসিক বিকাশে সহায়তা করে না বরং তাকে আত্মিকভাবে নির্জীব করে ফেলে সে শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা নয়। স্কুল-কলেজে শিক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয়, পরীক্ষায় পাশের জন্য নোট মুখস্থ করিয়ে শিক্ষার্থীদের জোর করে বিদ্যে গেলানো হয়। লেখক এ ধরনের শিক্ষার বিরোধিতা করেছেন। তিনি লাইব্রেরিতে গিয়ে নিজের মর্জিমাফিক বই পড়ে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের কথা বলেছেন।
উদ্দীপকের মোহিনীদেবীর ছেলে অমিত পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। অমিতের ইচ্ছা না থাকলেও মা খেলাধুলার পরিবর্তে পড়াশোনা করতে চাপ প্রয়োগ করে। এতে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। উদ্দীপকের মোহিনীদেবীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে 'বই পড়া' প্রবন্ধের স্কুল-কলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় মিল আছে। শিক্ষা মানুষ আনন্দের সঙ্গে ও স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে। ফলে মানুষের মানসিক ও আত্মিক বিকাশ সাধিত হয়। মূল্যবোধের শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। অথচ বাড়িতে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে পড়ানোয় উদ্দীপকের অমিত যেমন অসুস্থ হয়ে পড়ে তেমনই স্কুল-কলেজে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা শেষে ছাত্রদের আপন বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এভাবে উদ্দীপকের মোহিনীদেবীর কর্মকাণ্ডে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের জোর করে বিদ্য গেলানোর বিষয়টির ছায়াপাত ঘটেছে।
‘বই পড়া' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে পড়ে যথার্থ জ্ঞান অর্জনের যে প্রত্যাশা করেছেন তার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় শৈলবালার মানসিকতায় 'বই পড়া' প্রবন্ধের প্রাবন্ধিকের প্রত্যাশার সঠিক প্রতিফলন ঘটেছে।
'বই পড়া' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন “যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য, সে জাতির ধনের ভাড়েও ভবানী।” এ জন্য তিনি লাইব্রেরিতে নিজের ইচ্ছা মতো বই পড়ে জ্ঞানভান্ডার পূর্ণ করতে বলেছেন। স্কুল-কলেজের প্রচলিত পরীক্ষা পাশের জন্য নোট মুখস্থ তথা গেলানো বিদ্যা শিক্ষার্থীকে আত্মিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। তারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়তে অনীহা প্রকাশ করে। প্রাবন্ধিক এ ধরনের মানসিকতার বিরোধিতা করেছেন। তিনি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, বই পড়া এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রত্যাশা করেছেন।
উদ্দীপকের শৈলবালা ছেলের শিক্ষার ব্যাপারে ছেলের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ছেলে যেন আরও বই পড়তে পারে সেজন্য লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তে দিয়েছেন। এতে পড়ার প্রতি ছেলের আগ্রহ ও মানসিক প্রফুল্লতা বেড়ে যায়। উদ্দীপকে শৈলবালার মানসিকতায় 'বই পড়া' প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর প্রত্যাশার সঠিক প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন; কারণ লাইব্রেরিতে মানুষ স্বেচ্ছায় বিচিত্র ধরনের বই পড়ে। এতে মানুষের মনের সংযোগ থাকে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শিখলে মানসিক বিকাশ সাধন হয়। শৈলবালা সন্তানের জন্য লাইব্রেরি থেকে বই এনেছেন। আর বই পড়ার জন্য লাইব্রেরির বিকল্প নেই।
উদ্দীপকের শৈলবালা সন্তানের শিক্ষার জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে ছেলের পছন্দ অনুযায়ী বই এনে দিয়েছেন। 'বই পড়া' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রকৃত শিক্ষার জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তাই বলা যায়, শৈলবালার মানসিকতায় শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধরীর প্রত্যাশারই প্রতিফলন ঘটেছে।
