নৈশপ্রহরীর কাজ করে কোনোমতে কষ্টেসৃষ্টে চলে আজমত আলীর সংসার। দারিদ্র্যের কারণে ছেলেমেয়ের ছোটো ছোট আবদার পূরণ হয় না কখনও। এ নিয়ে স্ত্রীর অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু ছেলেমেয়ের ওসবে মাথাব্যথা নেই। দুই ভাইবোন সুযোগ পেলেই মেতে ওঠে নিজেদের জগতে। কোন পাখি কতটা ডিম পাড়ল, কার বাগানে কোন ফল পাকল- এসব খুঁজে বের করাই তাদের আসল কাজ। মনের আনন্দে পাড়াময় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহেই যেন তাদের সুখ।
দুর্গার বয়স দশ-এগারো বছর।
সর্বজয়া ঘাট থেকে চলে আসায় অপু-দুর্গার আম খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটল।
দুর্গা দুরন্ত এক কিশোরী। মাকে না জানিয়ে সে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বন্য ফলমূল সংগ্রহ করে। মা এসব দেখলে রাগ করবে বলে তারা লুকিয়ে লুকিয়ে উঠানের কাঁঠাল তলায় বসে আমের কুশি মাখিয়ে খায়। কিন্তু খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই মা এসে পড়ায় তাদের আম খাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটে।
উদ্দীপকের আজমত আলীর সঙ্গে 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের দারিদ্র্যক্লিষ্ট পিতা হরিহরের সাদৃশ্য বিদ্যমান।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের অপু-দুর্গার বাবা হরিহর দরিদ্র ব্রাহ্মণ। সে অন্নদা রায়ের বাড়িতে মাসিক আট টাকা বেতনে গোমস্তার কাজ করে। সময়মতো বেতন না দেওয়ায় হরিহর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তার ঘর মেরামত করতে পারছে না, পারছে না ছেলেমেয়ের বস্ত্রের জোগান দিতে। স্ত্রী সর্বজয়ার এটা নিয়ে অভিযেগের শেষ নেই।
উদ্দীপকের আজমত আলীও স্বল্প বেতনের একজন নৈশপ্রহরী। তাই কষ্টেসৃষ্টে চলে তার সংসার। ছেলেমেয়ের ছোটো ছোট আবদার রাখতে পারে না কখনো। এটা নিয়ে তার স্ত্রী দিন-রাত অভিযোগ করে যাচ্ছে। বিষয়টি 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের দারিদ্র্যক্লিষ্ট ব্রাহ্মণ হরিহরের অবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের অপু-দুর্গার শৈশবের দুরন্তপনার সর্বাত্মক রূপটি উদ্দীপকের আজমত আলীর ছেলেমেয়ের মাঝে ফুটে ওঠায় এতে গল্পের মূলভাব প্রতিফলিত হয়েছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পে শিশু-কিশোরের আনন্দঘন শৈশব ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। গ্রামীণ জীবনের প্রকৃতিঘনিষ্ঠ দুই ভাই-বোন অপু-দুর্গা। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্যের সেই কষ্ট তাদের মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠেনি। গ্রামীণ ফলফলাদি খাওয়ার আনন্দ এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাদের বিস্ময় ও কৌতূহল চিরন্তন শৈশবকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়।
উদ্দীপকের আজমত আলীর ছেলেমেয়ের মধ্যেও 'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের অপু-দুর্গার মতো প্রকৃতিঘনিষ্ঠ চিরন্তন শৈশবের দিকটি দৃশ্যমান। নৈশপ্রহরী বাবার সংসারের অভাব-অনটন তাদের শৈশবের আনন্দকে ম্লান করতে পারেনি। পাখির ডিম, অন্যের বাগানের ফলফলাদি সংগ্রহের প্রতি যেন তাদের ঝোঁক।
'আম-আঁটির ভেঁপু' গল্পের প্রধান উপজীব্য প্রকৃতির লালিত কিশোরী দুর্গার দুরন্তপনা। অপু ও দুর্গা দরিদ্র ব্রাহ্মণ হরিহরের সন্তান। বাবা তাদের মৌলিক চাহিদার জোগান দিতেই অক্ষম। ঋণগ্রস্ত পরিবারের সন্তান হলেও দারিদ্র্য তাদের শৈশবের চাঞ্চল্যে, ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। প্রকৃতির সংস্পর্শে তারা দারিদ্র্যকে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বিষয়টি উদ্দীপকের নৈশপ্রহরী আজমত আলীর ছেলেমেয়ের মধ্যেও লক্ষণীয়। তাই বলা যায় যে, আলোচ্য মন্তব্যটি যথার্থ।
