নন্দীপুর এলাকার চেয়ারম্যান মানিক সরকার। সম্প্রতি তার বাবার মৃত্যুর পর কুলখানিতে দশ গ্রামের মানুষকে দাওয়াত করে খাওয়ালেন। সবাই প্রাণভরে দোয়া করে গেল। কদিন পরেই মায়া গেলেন ঐ এলাকার দরিদ্র বর্গাচাষি হরিপদ বিশ্বাস। বাবার মৃত্যুশোর এবং সৎকারের চিন্তায় তার একমাত্র মেয়ে দীপালী কান্নায় ভেঙে পড়ল। পিতৃহারা অসহায় কিশোরীর শোকের মাতমে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠল। খবর পেয়ে হরিপদের বাড়িতে ছুটে গেলেন মানিক সরকার। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিলেন এবং তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুসারে হরিপদের সৎকারের সুব্যবস্থা করলেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'জগত্তারিণী পদক প্রদান করেছিল।
'অভাগীর জীবননাট্যের শেষ অঙ্ক' বলতে অভাগীর হতভাগ জীবনের শেষ সময়ের কথা বলা হয়েছে।
দুলের মেয়ে অভাগী রোগশয্যায় শায়িত। অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা হচ্ছে না। একমাত্র ছেলেটিও ছোট। তার ছেলে কাঙালী তাকে ঘটি বাঁধা দিয়ে ওষুধ এনে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অভাগী খায় না। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। লেখক তাই অভাগীর জীবননাটোর শেষ অঙ্ক বলতে অভাগীর হতভাগ্য জীবন শেষ হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন।
উদ্দীপকের বক্তব্য 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে সমাজ-বাস্তবতার নির্মম দিকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
তৎকালীন হিন্দু সমাজে জাত-পাতের ঘৃণ্য রূপ প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়। জাত-বৈষম্য মানুষকে মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। কিন্তু সমাজে ভালো মানুষও বসবাস করে। যাদের মধ্যে মানবতা বা মানবিকতা অক্ষুন্ন থাকে সবসময়।
'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে জাতপ্রথার ঘৃণ্য দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। অভাগী নীচ জাতের মেয়ে বলে ব্রাহ্মণের স্ত্রীর শবযাত্রা কাছে গিয়ে দেখতে পারেনি। মৃত্যুর পর তার একমাত্র সন্তান তার শেষ ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে দৌড়াদৌড়ি করেও জোগাড় করতে পারেনি সৎকারের জন্য কাঠ। সামন্তবাদের নির্মম রূপ ফুটে উঠেছে গল্পটিতে। অন্যদিকে উদ্দীপকে ঠিক এর ভিন্ন রূপের প্রকাশ ঘটে। মানিক সরকার একজন চেয়ারম্যান। সমস্ত ধর্মীয় সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি একজন দরিদ্র বর্গাচাষি হরিপদ বিশ্বাসের অসহায় মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, যার মধ্য দিয়ে মানবতার জয়গান প্রকাশ পেয়েছে। হরিপদের সৎকারের সুব্যবস্থা করে তিনি একদিকে যেমন ধর্মীয় গোঁড়ামিতে কুঠারাঘাত করেন। অন্যদিকে সামন্তবাদের ও জাতিভেদ প্রথার নির্মম রূপকে পদাঘাত করেন। তাই আমরা বলতে পারি যে, উদ্দীপকের বক্তব্য 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের সমাজ-বাস্তবতার নির্মম দিকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
ঠাকুরদাস মুখয্যে ও অধর রায় যদি চেয়ারম্যান সাহেবের মানসিকতা ধারণ করতেন, তাহলে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের পরিণতি অন্যরকম হতো- আমি এর সাথে একমত।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও বৈষম্য সবচেয়ে দুঃখজনক। সমাজের একশ্রেণির মানুষ এ বৈষম্য সৃষ্টি করে। যদি এই বৈষম্য ও বিভেদ না থাকত তবে সমাজ অনেক সুন্দর হতো।
উদ্দীপকে আমরা দেখি, নন্দীপুর এলাকার চেয়ারম্যান মানিক সরকার একজন মহৎ ও উদার ব্যক্তি। তিনি জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে মানুষকে সম্মান দিয়েছেন। মিথ্যা গৌরব-মর্যাদায় আঁকড়ে না থেকে একজন অসহায় বর্গাচাষির সৎকারের ব্যবস্থা করেন। তাদের ধর্মীয় বিধি অনুসারে হরিপদের সৎকারের ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেন সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার চেতনা। অন্যদিকে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে আমরা দেখি সামন্তপ্রভুদের নিষ্ঠুর রূপ। ঠাকুরদাস মুখুয্যে ও অধর রায়ের নিষ্ঠুরতায় কাঙালী পারেনি তার মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে, পারেনি কাঠের অভাবে মায়ের সৎকার করতে। কিন্তু যদি ঠাকুরদাস ও অধর রায় মানিক সরকারের চেতনাকে ধারণ করতেন তবে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের পরিণতি অন্যরকম হতো।
'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের ঠাকুরদাস মুখুয্যে ও অধর রায় সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সামন্তবাদী মনোভাব ও বৈষম্যপূর্ণ মানসিকতার কারণে মায়ের সৎকারে কাঙালীকে সাহায্য করেনি। কিন্তু উদ্দীপকের মানিক সরকার মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ায় দীপালীকে বুকে টেনে নিয়েছেন। তার পিতার সৎকার করেছেন। তাই বলা যায় যে, ঠাকুরদাস মুখুয্যে ও অধর রায় যদি মানিক সরকারের মতো মানসিকতা ধারণ করতেন তাহলে 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের পরিণতি অন্যরকম হতো- আমি এর সাথে একমত।
