ওই যে লাউয়ের জাংলা-পাতা ঘর দেখা যায় একটু দূরে
কৃষক-বালা আসছে ফিরে নদীর পথে কলসি পুরে,
ওই কুঁড়েঘর- উহার মাঝেই যে-চিরসুখ বিরাজ করে,
নাইরে সে সুখ অট্টালিকায়, নাইরে সে সুখ রাজার ঘরে!
কত গভীর তৃপ্তি আছে লুকিয়ে যে ওই পল্লি-প্রাণে,
জানুক কেহ নাই বা জানুক- সে কথা মোর মনই জানে।
'ধল-দীঘি' অর্থ মস্ত বড়ো দিঘি।
ধান-কাউনের খেতের ভেতর দীর্ঘ সরু সুতার মতো বাঁকা পথকে বোঝাতে কবি উদ্ধৃত চরণটি করেছেন।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লি-দুলালের দেশ অর্থাৎ পল্লিগ্রামে যেতে চান। পল্লিগ্রাম, প্রকৃতি যেন তাকে ঘিরে রেখেছে। তার বনের শীর্ষে রয়েছে আকাশ, পায়ের কাছে দিক-হারা মাঠ। সেখানে বেত-কেয়ার বনে ডাহুক ডাকে। কবি অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সেই গ্রামে যেতে চান। আর কবি যে পথে সেই গ্রামে যাবেন তার বর্ণনা করতে গিয়েই উল্লেখ করেন সে পথ ধান-কাউনের খেতের ভেতর দিয়ে যাওয়া সরু সুতার মতো।
পল্লিগ্রামের সৌন্দর্য চিত্রণে ও পল্লিগ্রামের সহজ প্রাণের আনন্দ বর্ণনার দিক থেকে উদ্দীপকটি 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
"যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লিপ্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন। এ কবিতায় প্রকৃতি যেন কবির আত্মার সঙ্গে কথা বলে। তিনি শুনতে চান ডাহুকের ডাক, যেতে চান পল্লির আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে। এই প্রকৃতিই তাঁর কাছে জীবনের আসল আশ্রয়।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি পল্লিগ্রামে যেতে চেয়েছেন। তার সেই গ্রাম প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য দিয়ে ঘেরা। কবি সেই গ্রামে যেতে চেয়েছেন সৌন্দর্য অবলোকন করতে এবং প্রাণে শান্তি ধারণ করতে। কবি আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে গ্রামে প্রবেশ করবেন। গ্রামের দুরন্ত বালকদের সঙ্গে তিনি খেলা করবেন। ধল-দিঘিতে সাঁতার কেটে রক্তকমল তুলে আনবেন। পাখির সঙ্গে ডাকবেন। অজানা ফুলের রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। গাছের শাখা দুলিয়ে হাজার রঙের ফুল তুলবেন। যে ঘাটে পল্লিবালারা কলসি ভরে পানি নেয়, সেই ঘাটের পাশে রেখে আসবেন ফুলের মালা। নিরালা নিঝুম অন্ধকারে কবি পল্লিমায়ের অপরূপ সৌন্দর্য অন্বেষণ করবেন। উদ্দীপকে কবি গ্রামের মুক্ত সহজ প্রাণের অনাবিল সুখকে উপস্থাপন করেছেন। কৃষক-বালা কলসি পুরে ফিরে আসে কুঁড়েঘরে। যার পাশে লাউয়ের জাংলা পাতা। এ পরিবেশেই চিরসুখ বিরাজ করে। পল্লির এই সহজ প্রাণ ও রূপ বর্ণনার দিক থেকেই উদ্দীপকটি আলোচ্য, কবিতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
কবির গ্রামে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে বলা যায়, "কত গভীর তৃপ্তি আছে লুকিয়ে যে ওই পল্লি-প্রাণে"- উদ্দীপকের এই চরণটি যেন 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার কবির গ্রামে ফেরার ব্যাকুলতাকেই তুলে ধরেছে মন্তব্যটি যথার্থ।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় কবি যেমন প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তেমনই গ্রামের মানুষের সরলতাকেও শ্রদ্ধা করেন। সেই পল্লিবালার সরল চিত্ত, দস্যি ছেলেদের হাসি, গ্রামের আঁকাবাঁকা সরু মেঠোপথ- সবকিছুই কবির কাছে আপন। কবি পল্লির ওই প্রাণোচ্ছল জীবনেই ফিরে যেতে চান।
'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতায় দেখা যায়, পল্লিগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শেকড়ের প্রতি টান সব সময়ই কবিকে আকৃষ্ট করে। গ্রামের অনাবিল সৌন্দর্য কবিমনকে উদ্ভাসিত করে। টেনে নিতে চায় তার কাছে। কবি তাই পল্লি-দুলালকে বলেন যে তিনি তার গ্রামে যেতে চান। পল্লিগ্রাম, প্রকৃতি যেন তাকে ঘিরে রেখেছে। পল্লির প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গের সঙ্গে কবি নিজেকে মিশিয়ে নিতে চান। পাড়ার দস্যি ছেলেদের সঙ্গে তিনি খেলা করবেন। যে পথে গাঁয়ের মেয়ে কদম-কলি ছড়িয়ে হেঁটে চলে সেই পথে কবি হেঁটে বেড়াবেন। তিনি পাখির সঙ্গে ডাকবেন। অজানা ফুলের রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। পল্লিবালারা যে ঘাটে জল ভরতে আসবে সেই ঘাটে ফুলের এর মালা রেখে আসবেন। নিরালা নিঝুম অন্ধকারে কবি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন।
উদ্দীপকের "কত গভীর তৃপ্তি আছে লুকিয়ে যে ওই পল্লি-প্রাণে" চরণটি দ্বারা পল্লির অকৃত্রিম পরিবেশে বেড়ে ওঠা হৃদয়ে যে প্রশান্তি বিরাজ করে তা বোঝানো হয়েছে। পল্লির সৌন্দর্য হৃদয়ে জাগায় সুখের আবহ। যে আবহে কবি মুগ্ধ হতে চান আলোচ্য কবিতায়। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের চরণটি 'যাব আমি তোমার দেশে' কবিতার কবির গ্রামে ফেরার ব্যাকুলতাকেই তুলে ধরেছে।
