‘অন্ধবধূ’ কবিতায় অন্ধবধূ এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষ। তার অনুভবের জগৎ সমৃদ্ধ। অনুভবশক্তি দিয়ে সে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এমনকি ঋতু ও প্রকৃতির পরিবর্তনও সে বুঝতে পারে। আত্মমর্যাদাবোধেও সে সচেতন। দিঘির ঘাটে যখন ‘শ্যাওলা পড়া পিছল সিঁড়ি জাগে’ তখন সে পিছল খেয়ে জলে পড়ে ডুবে মরার ভয় করে। সে এও ভাবে যে, ডুবে মরলে তার অন্ধত্বের অভিশাপ ঘুচত।
সুভার প্রকৃত নাম হলো সুভাষিণী।
সুভা জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী বলে তার প্রতি বিরক্ত হয়ে মা সুভাকে গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করেন।
'সুভা' গল্পে সুভা জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী। এ কারণে সুভাকে নিয়ে তার পিতা-মাতার মনে সদা সংশয় কাজ করে। পিতা-মাতার মনে সে ছিল সদা জাগরুক। সুভার এই প্রতিবন্ধিতাকে মা সুভাকে নিজের ত্রুটিস্বরূপ দেখতেন। কেননা মায়েরা সাধারণত কন্যাকে নিজের অংশ বলে মনে করেন। কন্যার কোনো ত্রুটি যেন মায়ের কারণেই হয়। মূলত মায়ের এরূপ চিন্তার কারণেই তিনি সুভাকে গর্ভের কলঙ্ক মনে করেন।
উদ্দীপকের সঙ্গে 'সুভা' গল্পের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি হলো প্রতিবন্ধিতা ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক অনুভূতি।
'সুভা' গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অতি মমত্বের সঙ্গে বাক্প্রতিবন্ধী সুভার মন ও চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতির সূক্ষ্মতর দিকগুলো উপস্থাপন করেছেন। সুভা সকলের কাছে অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার হলেও সে বিপুল নির্বাক প্রকৃতির কাছে মুক্তির আনন্দ খুজে পায়। মূক পোষা প্রাণীগুলোর কাছে সে মুখর।
'সুভা' গল্পে লেখক সুভা নামের এক বাষ্প্রতিবন্ধী কিশোরীর কথা তুলে ধরেছেন। গল্পে দেখা যায়, সুভা প্রতিবন্ধী হওয়ায় কেউ তার সঙ্গে মেশে না। বাবা তাকে ভালোবাসলেও মা তাকে গর্ভের কলঙ্ক মনে করেন। নিঃসঙ্গ জীবনে সুভার সঙ্গী হয়ে ওঠে প্রকৃতি। প্রকৃতির কাছে সে আশ্রয় নেয়। সুভার অনুভূতিশক্তিও প্রবল। তার পরও তার আবেগ-অনুভূতি কোথাও স্থান পায় না। আলোচ্য গল্পের সুভার মতো উদ্দীপকের 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূ। তারও অনুভূতিশক্তি প্রবল। প্রকৃতির নানা পরিবর্তন সে উপলব্ধি করতে পারে। উদ্দীপকের অন্ধবধূর প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য যেন আলোচ্য গল্পের সুভার নামান্তর। এভাবেই প্রতিবন্ধিতা ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক জগৎ তৈরির দিক থেকে উদ্দীপকের সঙ্গে 'সুভা' গল্পের সাদৃশ্য বিদ্যমান।
"সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপক ও 'সুভা' গল্পের পরিণতি সম্পূর্ণ আলাদা" মন্তব্যটি যথার্থ। কারণ অনুভূতি প্রকাশে, অপারগ নিরুপায় সুভা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে প্রস্থানে বাধ্য হয়।
'সুভা' গল্পে সুভা বাক্প্রতিবন্ধিতার কারণে সকলের কাছে অবজ্ঞা, অবহেলা পেলেও প্রকাশের ক্ষমতা তার ছিল না। কেউ তাকে বোঝেনি। কেউ তার সঙ্গে খেলত না। শেষাবধি সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীরব বেদনায় তার চিরপরিচিত গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়।
'সুভা' গল্পে লেখক বাকপ্রতিবন্ধী এক কিশোরীর প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও মমত্ববোধ প্রকাশ করেছেন। গল্পে দেখা যায়, সুভা কথা বলতে পারে না। তার সমবয়সিরা কেউ তার সঙ্গে মেশে না। বাবা তাকে ভালোবাসলেও মা তাকে গর্ভের কলঙ্ক বলে জ্ঞান করেন। নিঃসঙ্গ সুভা তখন প্রকৃতিতে আশ্রয় নেয়। 'সুভা' গল্পের সুতার সঙ্গে উদ্দীপকের 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর সাদৃশ্য রয়েছে।। তবে উদ্দীপক ও 'সুভা' গল্পের পরিণতি সম্পূর্ণ আলাদা।
উদ্দীপকের অন্ধবধূর অনুভূতিশক্তি প্রবল। সেও সুভার মতো। প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য স্থাপন করেছে। তবে 'সুভা' গল্পে সুভার যে। পরিণতি লেখক অঙ্কন করেছেন তা অনেক বেশি মর্মস্পর্শী। উদ্দীপকের অন্ধবধূ তবু নিজের অনুভূতি, তার প্রতি চারপাশের। অবহেলা প্রকাশ করতে পারে কিন্তু সুভা কোনো অনুভূতিরই প্রকাশ করতে পারে না। উদ্দীপকের অন্ধবধূকে দেখা যায়, সে নিজের মৃত্যু কামনা করে হলেও কষ্টের প্রকাশ করে কিন্তু সুভা তাও পারে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার সঙ্গে তার নীরব প্রস্থান পাঠক হৃদয়কে আরও বেশি নাড়া দেয়। তাই বলা যায়, সাদৃশ্য থাকলেও উদ্দীপক ও 'সুভা' গল্পের পরিণতি সম্পূর্ণ আলাদা।
