| ㅤ | A. Nayan15 Oct 2026 (2 weeks ago) |
সৃজনশীলঃ ‘ওয়াজ করিবার সময়…’ ঢাকা বোর্ড ২০১৭ – লালসালু, নাটক ও উপন্যাস, বাংলা ১ম পত্র (এইচএসসি)

ওয়াজ করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত। সে জয্বাকে মুরিদগণ ‘ফানাফিল্লাহ’ বলিত। এই ‘ফানাফিল্লাহ’র সময় পীর সাহেব ‘জ্বলিয়া গেলাম’ পুড়িয়া গেলাম’ বলিয়া চিৎকার করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িতেন। ……তাই জয্বার সময় একখণ্ড কালো মখমল দিয়া পীর সাহেবের চোখ-মুখ ঢাকিয়া দিয়া তাঁহার হাত-পা টিপিয়া দিবার ওসিয়ত ছিল।
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
১ম পত্র · অধ্যায় ২
তাহের আর কাদের মজিদকে প্রথম দেখেছিল মতিগঞ্জের সড়কের ওপরে।
মজিদ মহাব্বতনগর গ্রামে যে প্রভাব বিস্তার করেছিল তার শক্তি সে পেয়েছিল সালু কাপড়ে আবৃত মাজার থেকে প্রশ্নোক্ত উক্তিটিতে এ কথাই প্রকাশিত হয়েছে।
মজিদ মহব্বনগর গ্রামে আগন্তুক হিসেবে প্রবেশ করে একসময় সেই গ্রামেই মজিদ শক্তির শিকড় গেড়েছিল। এই শক্তি সে পেয়েছিল মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সরল মানুষের বিশ্বাস থেকে। সালু কাপড়ে আবৃত মাজারটি মজিদকে দিয়েছিল শক্তি যা দিয়ে গ্রামে সে প্রভাব বিস্তার করেছিল। প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা এ কথাই বোঝানো হয়েছে।
উদ্দীপকের পীর সাহেব 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ চরিত্রের প্রতিনিধি।
'লালসালু' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মজিদ কুসংস্কার, শঠতা, প্রতারণা ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতীক। ধর্মকে ব্যবহার করে, সে মহব্বতনগর গ্রামে তার অপ্রতিহত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছে। তার প্রতিষ্ঠিত মাজারে লোক জমায়েত করে ধর্মপালনের ব্যবস্থা করে সে। মাজারে সমবেত সকলের মাঝে বসে সে জিকির শরু করে। জিকির করতে করতে মজিদ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সেসময় তার ভেতর থেকে বিচিত্র আওয়াজ আসতে থাকে। দেহ বারবার ঝুঁকে আসে যেন খোদার সন্নিকটে চলে গেছে সে। গ্রামের সরল মানুষ এ অবস্থায় তাকে নিয়ে ব্যস্ত হলেও তার এই ব্যাপারটি মূলত ভণ্ডামি।
উদ্দীপকে পীর সাহেবকেও ওয়াজ করার সময় মজিদের অনুরূপ অবস্থায় দেখা যায়। ওয়াজ করতে করতে তিনি খোদার নৈকট্য লাভ করেছেন তা বোঝাতেই এ আয়োজন। আর এই আয়োজনে তার মুরিদরা অন্ধবিশ্বাসের কারণে তাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়। মূলত নিজের অপ্রতিহত ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যেই এরকম আচরণ করে উদ্দীপকের পীর সাহেব। উপন্যাসের মজিদও একইভাবে মানুষেকে প্রতারিত করতে অনুরূপ কাজ করে। প্রচলিত বিশ্বাস কাঠামো ও প্রথাবদ্ধ জীবনধারার প্রভু হতে চায়। প্রতিষ্ঠার লোভে তার মতোই প্রতারণার আশ্রয় নেন উদ্দীপকের পীর সাহেব। সেদিক বিবেচনায় উদ্দীপকের পীর সাহেব 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদ চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।
গ্রামীণ সমাজ জীবনের বাস্তবতায় কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের জয়জয়কার, যার ইঙ্গিত রয়েছে 'লালসালু' উপন্যাসের সমাজচিত্র হিসেবে উদ্দীপকের বিষয়বস্তুতে।
'লালসালু' উপন্যাসের কাহিনিবিন্যাসে ও চরিত্র নির্মাণে শৈল্পিক দক্ষতায় ঔপন্যাসিক তুলে ধরেছেন গ্রামীণ সমাজজীবনের বাস্তব অথচ অন্ধকারাচ্ছন্ন এক দিক। গ্রামীণ সমাজে স্বার্থ ও লোভের বশবর্তী হয়ে এক শ্রেণির লোক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে নানা প্রতারণার আশ্রয় নেয়। আলোচ্য উপন্যাসে তারই প্রতীকী চরিত্র মজিদ।
উদ্দীপকের পীর সাহেব মজিদের মতোই ভণ্ড ও প্রতারক এক কূপমণ্ডুক চরিত্র। পীর সাহেব ও মজিদ সরলপ্রাণ মানুষগুলোকে ঠকিয়ে স্বার্থোদ্ধার করে নেয়। মানুষের মনকে আলোড়িত করতে তারা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে চায়। এ কারণে, পীর সাহেব ওয়াজ করতে করতে ইশ্বরের নৈকট্যপ্রাপ্ত হয়েছে এমন ভূমিকায় অবর্তীণ হয়। একই কাজ করতে দেখা যায়, 'লালসালু' উপন্যাসের মজিদকেও।
ধর্ম মানুষকে কল্যাণের পথে আনে, কিন্তু পশ্চাৎপদ গ্রামীণ সমাজে ধর্মের মূল ভিত্তিটাকে দুর্বল করে দিয়েছে কুসংস্কার এবং অন্ধবিশ্বাস। স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষ সরল ও ধর্মপ্রাণ এসব মানুষকে বিভ্রান্তি ও ভীতির মধ্যে রাখে। এর কারণ তাদের শোষণ প্রক্রিয়াকে চালু রাখা। ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লহ্ সামাজ বাস্তবতার এই ভয়াবহ চিত্রটিই এঁকেছেন 'লালসালু' উপন্যাসে। গ্রামীণ সমাজের মানুষকে ঠকানোর যে চিত্রগুলো সেখানে আমরা দেখতে পাই আলোচ্য উদ্দীপকটি তারই একটি চিত্রকল্প। অর্থাৎ উদ্দীপকটি উপন্যাসে বিধৃত গ্রামীণ সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে।