প্রতিবন্ধীরা জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত ধারায় অন্যদের মতো সমতালে পা মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু যথাযথ মনোযোগ, সহযোগিত ও সুযোগ পেলে তারাও দুঃখের অন্ধকার ছেড়ে স্বনির্ভর এক আলোচিত জীবনের অধিকারী হতে পারে, এমনকি হয়ে উঠতে পারে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব। অন্ধত্বকে অস্বীকার করে যেমন পেয়েছেন ‘ইলিয়াড’, ‘ওডেসি’ রচয়িতা মহাকবি হোমার কিংবা বিটোফেন, বি নিজের বধিরতা সত্ত্বেও সৃষ্টি করেছেন অপূর্ব সব সুর। আধুনিককালে সাড়া জাগানো বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিংও প্রতিবন্ধিতাকে পরাভূ করে বিশ্বব্যাপী শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করে নিয়েছেন। এমন উদাহরণ অসংখ্য।
শীতল জল মায়ের স্নেহের মতো।
চারপাশের সবকিছু অনুভব করতে পারে বলেই অন্ধবধূকে অনুভবঋদ্ধ মানুষ বলা যায়।
অন্ধবধূ অন্ধত্বের কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করে। ইন্দ্রিয় সচেতনতা দিয়ে সে অনেক কিছুই অনুভব করতে পারে। পায়ের তলায় নরম কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে সেটা যে ঝরা বকুল ফুল তা সে বুঝতে পারে। কোকিলের ডাক শুনে নতুন ঋতুর আগমন অনুমান করতে পারে সে। আত্মমর্যাদা বোধেও সে সমৃদ্ধ। সে শ্যাওলায় পা পিছলে ডুবে মরার শঙ্কা করে; অন্ধত্বের অভিশাপ ঘোচার কথা ভাবে।
পুকুরঘাটের নতুন সিঁড়ি জেগে ওঠার ব্যাপারটা সে টের পায়। এসব বিবেচনায় অন্ধবধূ অনুভবঋদ্ধ মানুষ।,
অন্ধবধূর প্রতিবন্ধিতা অতিক্রম করতে না পারার বিষয়টিই উদ্দীপকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
'অন্ধবধূ' কবিতায় বধূটি বুঝে গেছে, তার নিজের দুঃখ শুধু সে নিজেই বুঝবে। কারও কাছে অভিযোগ বা কথা বলার কেউ নেই। তাই প্রকৃতির সাথে কথা বলেই সে বেঁচে থাকে। দিঘির স্নিগ্ধ শীতল জল তাকে ব্যথা ভুলতে সাহায্য করে। স্বাভাবিক মানুষদের কাছ থেকে অবহেলা অবজ্ঞা পেয়ে সে প্রকৃতির মাঝে নীরব আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।
'অন্ধবধূ' কবিতায় অন্ধবধূটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও অনুভবের সাহায্যে জগতের রূপ-রস-গন্ধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। তথাপি প্রতিবন্ধিতাকে অতিক্রম করে সে সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষদের মতো কর্মময় হয়ে উঠতে পারেনি। উদ্দীপকটিতে ঠিক এর বিপরীত চিত্র ফুটে উঠেছে। মহাকবি হোমার, বিটোফেন, স্টিফেন হকিং প্রমুখ বিশ্ববরণীয় ব্যক্তিবর্গ প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বেও পুরো পৃথিবীতে নিজ নিজ কর্মগুণে প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। এভাবেই 'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূর প্রতিবন্ধিতাকে জয় করতে না পারার বিষয়টিই উদ্দীপকের সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
প্রতিবন্ধী মানুষদেরও ইন্দ্রিয়সচেতনা থাকায় "উদ্দীপক ও 'অন্ধবধূ' কবিতার প্রেক্ষিতে এটি বলা যায়, প্রতিবন্ধীরাও যথার্থ সুযোগ পেলে নিজেদের স্বাভাবিক মানুষের মতোই বিকশিত করে তুলতে পারে"- মন্তব্যটি যথার্থ।
'অন্ধবধূ' কবিতায় বধূটির বাঁচার প্রধান শক্তি হয় অনুভূতি। চোখ নেই, তবুও স্পর্শ, গন্ধ ও শব্দ তাকে বাঁচিয়ে রাখে। এই তিন ইন্দ্রিয় তার পথপ্রদর্শক। কিন্তু এগুলোও সব সময় যথেষ্ট নয়- কারণ বিপদ লুকিয়ে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। কবি দেখিয়েছেন- প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন একই সাথে শক্তিহীনতা ও অসহায়ত্বের সমন্বয়। তাই তাদের প্রতি সকলের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।
'অন্ধবধূ' কবিতার অন্ধবধূ যথেষ্ট অনুভবঋদ্ধ মানুষ। তবে একে তো বাংলার পল্লিগ্রামের বধূ তার উপর জন্মান্ধ, তাই সে কখনই বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। এ কারণেই সে স্বনির্ভর নয়। স্বামীর প্রতীক্ষা আর মনের কষ্টে গৃহকোণে বন্দি থাকাই তার জীবন-বাস্তবতা। উদ্দীপকে বলা হয়েছে, যথাযথ মনোযোগ, সহযোগিতা ও সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীরাও দুঃখের অন্ধকার ছেড়ে স্বনির্ভর এক আলোচিত জীবনের অধিকারী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ উদ্দীপকে হোমার, বিটোফেন, স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের কথা উঠে এসেছে।
প্রতিবন্ধীরাও মানুষ। তারাও অন্যদের মতো স্বনির্ভর ও বিকশিত হয়ে উঠতে পারে। তবে এর জন্য তাদের প্রয়োজন সমাজের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা। তাই উদ্দীপক ও 'অন্ধবধূ' কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে দ্ব্যর্থহীনভাবেই বলা যায়, যথার্থ সুযোগ, সহযোগিতা, সুবিধা ও ভালোবাসা পেলে প্রতিবন্ধীরাও সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো নিজেদের বিকশিত করে তুলতে পারে।
