| ㅤ | A. Nayan16 Oct 2026 (2 weeks ago) |
সৃজনশীলঃ ‘রহিম ও করিম…’ আনন্দ মোহন কলেজ ২০২৫ – ই, পৌরনীতি ও সুশাসন, পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র (এইচএসসি)

রহিম ও করিম এক সেমিনারে অংশগ্রহণ করে জানতে পারল যে, বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্সের যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে বহু বাধা অতিক্রম করতে হচ্ছে। সেমিনারে মূল প্রবন্ধে উপস্থাপক ই-গভর্নেন্সের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উপায়গুলো নির্দেশ করলেন। তিনি বললেন, শাসকবর্গ এ ব্যবস্থা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে এবং এতে বেকারত্ব বেড়ে যেতে পারে। তবে সার্বিক বিবেচনায় এ ব্যবস্থায় সুবিধা বেশি।
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
১ম পত্র · অধ্যায় ৪
সরকারি তথ্য ও সেবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌছানোর ব্যবস্থাই হলো ই-গভর্নেন্স (Electronic Governance)।
ই-গভর্ন্যান্স ও সংশ্লিষ্ট সেবার সুবিধাসমূহ
আপনার দেওয়া তালিকাটি ই-গভর্ন্যান্স এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিককে নির্দেশ করে। নিচে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা : সরকারি সকল তথ্য, আইন এবং সেবার বিবরণ অনলাইনে প্রকাশ করায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আসে। এর ফলে, নাগরিকেরা সহজেই জানতে পারে কোন সেবা কীভাবে পাওয়া যাবে এবং কোনো কাজ সম্পন্ন হতে দেরি হলে তার কারণ কী। এটি সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বা জবাবদিহি করতে সাহায্য করে।
২. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস : অনলাইন সেবা চালু হওয়ায় অনেক কাজ এখন ঘরে বসেই করা যায়। এতে সনাতন পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রিতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমে আসে, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বহুলাংশে হ্রাস করে।
৩. দুর্নীতি রোধ : ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদান এবং অর্থ লেনদেনের ফলে মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি সংস্পর্শ কমে যায়। প্রতিটি কার্যক্রমের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় অবৈধ লেনদেন বা দুর্নীতির সুযোগ কমে আসে।
৪. ই-হেলথ : ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করাকে ই-হেলথ বলে। এর মধ্যে রয়েছে টেলিমেডিসিন, অনলাইনে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন এবং স্বাস্থ্য তথ্য সংরক্ষণ, যা গ্রামীণ বা দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে।
৫. সর্বজনীন তথ্য প্রবাহ : ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে তথ্যকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এর ফলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হয় এবং জনগণ সহজেই যেকোনো প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।
উদ্দীপকের আলোকে ই-গভর্ন্যান্সের প্রতিবন্ধকতা
উদ্দীপকে বক্তার বক্তব্যে বাংলাদেশে ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান প্রতিবন্ধকতার কথা ফুটে উঠেছে। এগুলো হলো: ১. শাসকবর্গের দ্বারা ব্যবস্থার অপব্যবহারের ঝুঁকি। ২. প্রযুক্তির কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কা।
নিচে এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. শাসকবর্গের স্বার্থে ব্যবহার: ই-গভর্ন্যান্সের মূল উদ্দেশ্য হলো শাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা। কিন্তু উদ্দীপকের বক্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, শাসক শ্রেণি বা ক্ষমতাশালীরা এই ডিজিটাল ব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে জনগণের উপর নজরদারি বাড়াতে পারে, তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে অথবা নিজেদের পছন্দের লোকদের সুবিধা দিয়ে দুর্নীতি করতে পারে। এর ফলে, ই-গভর্ন্যান্সের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং এটি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে শাসকবর্গের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে, যা সুশাসনের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
২. বেকারত্ব বৃদ্ধি: ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের ফলে অনেক সরকারি কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় (automated) হয়ে যায়। সনাতন পদ্ধতিতে যে কাজগুলো সম্পন্ন করতে অনেক লোকবলের প্রয়োজন হতো, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেই কাজগুলো অল্প সময়ে এবং কম লোক দিয়েই করা সম্ভব হয়। এর ফলে, বিশেষ করে কায়িক শ্রম বা প্রথাগত দাপ্তরিক কাজে নিযুক্ত কর্মীদের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। যদি এই কর্মীদের নতুন প্রযুক্তির জন্য প্রশিক্ষিত করে বিকল্প কাজের সুযোগ তৈরি করা না যায়, তবে প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনের কারণে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা একটি বড় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা।
সুতরাং, বক্তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সামাজিক চ্যালেঞ্জই বাংলাদেশে ই-গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের পথে প্রধান বাধা।
উদ্দীপকের আলোকে ই-গভর্ন্যান্সের সুবিধা বিশ্লেষণ
উদ্দীপকে বক্তা ই-গভর্ন্যান্সের কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করলেও, "সার্বিক বিবেচনায় এ ব্যবস্থায় সুবিধা বেশি"—এই উক্তিটির মাধ্যমে এর ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাবের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। পাঠ্যবইয়ের আলোকে ই-গভর্ন্যান্সের এই সুবিধাগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ই-গভর্ন্যান্সের অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো এটি সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিয়ে আসে। সরকারের সকল তথ্য, আইন, নীতিমালা এবং সেবার বিবরণ অনলাইনে বা সরকারি পোর্টালে প্রকাশ করায় জনগণ সহজেই সবকিছু জানতে পারে। এর ফলে, কোনো কাজের বিলম্ব বা অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
২. দুর্নীতি হ্রাস: ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদান এবং অর্থ লেনদেন করার ফলে নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন কমে যায়। প্রতিটি কার্যক্রমের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় অবৈধ লেনদেন, ঘুষ বা দুর্নীতির সুযোগ বহুলাংশে হ্রাস পায়। এটি একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
৩. দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদান: ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে নাগরিকেরা এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন সরকারি সেবার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং সেবা গ্রহণ করতে পারেন। যেমন: অনলাইনে বিল পরিশোধ, পরীক্ষার ফলাফল জানা, জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্টের আবেদন ইত্যাদি। এর ফলে, সনাতন পদ্ধতির দীর্ঘসূত্রিতা এবং হয়রানি থেকে মানুষ মুক্তি পায়।
৪. সময় ও অর্থের সাশ্রয়: অনলাইনে সেবা গ্রহণ করার ফলে নাগরিকদের এখন আর সরকারি অফিসে যাতায়াতের প্রয়োজন হয় না। এতে তাদের সময় এবং অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হয়। সরকারের দিক থেকেও কাগজের ব্যবহার, ফাইল সংরক্ষণ এবং অন্যান্য দাপ্তরিক খরচ কমে আসে।
৫. তথ্যের সহজলভ্যতা ও নাগরিক ক্ষমতায়ন: ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হয়। জনগণ সহজেই যেকোনো প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। এটি নাগরিকদের ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে।
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, উদ্দীপকের বক্তার মন্তব্যটি যথার্থ। কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও, ই-গভর্ন্যান্স একটি দেশের শাসনব্যবস্থা ও নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে, তার গুরুত্ব অনেক বেশি।