সিরাজুম-মুনিরা, একটি অনুন্নত সমাজের একজন দরিদ্র মহিলা, ২০০০ সালে হাসান শাহের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। এই দম্পতির পরপর তিনটি কন্যা সন্তান হয়। তারা আরও একটি সন্তানের প্রত্যাশা করছেন এবং অধীর আগ্রহে একটি পুত্র সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন। এটি লক্ষণীয় যে হাসান শাহ একটি রক্ত-সম্পর্কিত বংশগত ব্যাধির নীরব বাহক।
অ-ডারউইনীয় অভিব্যক্তি হলো প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়াই কোনো জীবের বংশগতি উপাদানে পরিবর্তন আসার প্রক্রিয়া।
জীবের সব দৃশ্য এবং অদৃশ্যমান লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী এককের নাম জিন। এর অবস্থান জীবের ক্রোমোজোমে। সাধারণত জীবের একটি বৈশিষ্ট্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট জিন থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক জিন মিলিতভাবে একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশে সহায়তা করে। আবার কোনো কোনো সময় একটি জিন একাধিক বৈশিষ্ট্যও নিয়ন্ত্রণ করে। একারণে জিনকে বংশগতির নিয়ন্ত্রক বলা হয়।
উদ্দীপকের তথ্য অনুযায়ী, হাসান শাহ একটি রক্ত-সম্পর্কিত বংশগত রোগের নীরব বাহক। অর্থাৎ তিনি নিজে আক্রান্ত না হলেও প্রচ্ছন্ন ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন। রোগটি হলো থ্যালাসেমিয়া।
ধরা যাক, R হচ্ছে সুস্থ জিন এবং হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া রোগের জন্য দায়ী জিন। তাহলে হাসান শাহের জিনোটাইপ হবে Rr। অন্যদিকে, সিরাজুম মুনিরাকে স্বাভাবিক ধরে নিলে তার জিনোটাইপ হলো RR। পিতা-মাতার গ্যামেট থেকে সন্তানদের সম্ভাব্য জিনোটাইপ নির্ণয় করা হলো-
উপরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুনিরা হাসান দম্পতির সন্তানদের সম্ভাব্য জিনোটাইপ হতে পারে RR অথবা Rr, যার উভয় ক্ষেত্রেই সন্তান রোগমুক্ত হবে। সন্তানদের মধ্যে RR অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৫০% এবং Rr অর্থাৎ নীরোগ বাহক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ৫০%। জিনোটাইপ, যা রোগাক্রান্ত অবস্থা নির্দেশ করে, তা তৈরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
অতএব, সিরাজুম মুনিরাকে স্বাভাবিক ধরে নিলে উক্ত দম্পতির প্রত্যাশিত সন্তানের মধ্যে উল্লেখিত থ্যালাসেমিয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অনুন্নত সমাজ সিরাজুম-মুনিরাকে পরপর কন্যাসন্তান জন্মের জন্য দোষারোপ করলে তা হবে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ বংশগতিবিদ্যা অনুযায়ী সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ সম্পূর্ণভাবে পিতার ওপর নির্ভর করে। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
মানব লিঙ্গ নির্ধারণে সেক্স ক্রোমোজোম (X ও Y) মূল ভূমিকা পালন করে। নারীর সেক্স ক্রোমোজোম জোড়া হলো XX, আর পুরুষের ক্ষেত্রে XY। মায়ের ডিম্বাণু সবসময় X ক্রোমোজোম বহন করে, কিন্তু বাবার শুক্রাণু X বা Y উভয়টিই বহন করতে পারে। ডিম্বাণুটি একটি X বা Y ক্রোমোজোম বহনকারী পুংজননকোষ বা শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হতে পারে। ফলস্বরূপ সৃষ্ট জাইগোটে দুটি X ক্রোমোজোম অথবা একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম থাকতে পারে। দুটি X ক্রোমোজোম নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটি কন্যা সন্তান (XX) হবে এবং একটি X ও একটি Y নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু পুত্র সন্তান (XY) হবে। নিচে তা চেকারবোর্ড এর মাধ্যমে দেখানো হলো-
উপরের আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, সিরাজুম মুনিরাকে তার পরপর কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য দোষারোপ করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
