‘উদ্দীপক-১:
“হোক না যত বড়ো বীর, রাজা জমিদার
সুন্দর নারী, সুন্দর বাড়ি, ঘড়ি ট্রানজিস্টার
একদিন আমি যে এই পৃথিবীর লোক ভুলে যাবে সবে।”
উদ্দীপক-২ :
“পথের ধারে বাজবে বেণু
নদীর কূলে চরবে ধেনু
আঙিনাতে খেলবে শিশু
পাখিরা গান গাবে।
তবুও দিন যাবে গো দিন যাবে।”
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় বেবিলন ছাই হয়ে আছে।
“সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে”- কবি একথাটি বলেছেন মানুষের স্বপ্নের মরণ নেই বলে।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতাটিতে কবি গভীর জীবনতৃষ্ণা নিয়ে বিশেষ এক সত্য উন্মোচিত করেছেন। মরণশীল ব্যক্তিমানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, কিন্তু প্রকৃতিতে থাকে চিরকালের ব্যস্ততা। বিচিত্র বিবর্তনের মধ্যেও প্রকৃতি তার রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে প্রবহমান থাকবে। কবি মনে করেন তিনি যখন থাকবেন না তখনও প্রকৃতি তার অফুরন্ত ঐশ্বর্য নিয়ে মানুষের স্বপ্ন, সাধ, কল্পনাকে তৃপ্ত করে যাবে। প্রকৃতিতে থাকবে না সেই মৃত্যুর রেশ। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মৃত্যু আছে কিন্তু এ জগতে সৌন্দর্যের মৃত্যু নেই, মানুষের স্বপ্নেরও মরণ নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্বপ্ন নিয়ে মানুষ এগিয়ে চলে।
উদ্দাপক-১-এ 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মানুষের মরণশালতা ও জাগতিক সবকিছুর ক্ষয়িষ্ণুতার দিকটি ফুটে উঠেছে।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় কবি মানুষের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা বলেছেন। তিনি জানেন একদিন তিনি চলে যাবেন তবু প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্য বিনষ্ট হবে না। মানুষ ও মানুষের তৈরি সভ্যতা ধ্বংস হলেও প্রকৃতি টিকে থাকবে। মানুষ তার সমস্ত ক্ষমতা, সৌন্দর্য ও সম্পদ ফেলে রেখে এ পৃথিবী থেকে চলে যাবে।
উদ্দীপক-১ মানুষ ও তার সৃষ্ট বস্তুর নশ্বরতা ও ক্ষয়িষ্ণুতার চিত্র তুলে ধরে। বীর, রাজা, জমিদার, সুন্দর নারী, বাড়ি, ঘড়ি- সবকিছুই একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং পৃথিবী তাদের ভুলে যাবে। এই চেতনা 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার, 'আমি চলে যাব' ও সভ্যতার ধ্বংসের বোধের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কবি জানেন, তাঁর মৃত্যুর পরেও চালতাফুল শিশিরে ভিজবে, লক্ষ্মীপেঁচা গান গাইবে, খেয়ানৌকা নদীতে ভাসবে। সব ধ্বংস হলেও প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ অমর। কেবল মানুষ ও মানুষের তৈরি জিনিস কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এভাবেই উদ্দীপক-১ এ কবিতার মৃত্যুচেতনার বিষয়টির প্রতিফলন ঘটেছে।
"উদ্দীপক-২-এর চেতনাই হলো 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল ভাবনা"- মন্তব্যটি যথার্থ; কারণ উদ্দীপক-২ প্রকৃতির চিরন্তন প্রাণচাঞ্চল্য ও জীবনের স্বাভাবিক ধারাকে তুলে ধরেছে যা কবিতার মূল ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, মানুষের মৃত্যু হলেও প্রকৃতি অবিনশ্বর। চালতাফুল শিশিরের জলে ভিজবে, লক্ষ্মীপেঁচা তার লক্ষ্মীটির জন্য গান গাইবে, খেয়ানৌকা নদীতে ভাসবে- এগুলোর অবসান হয় না। প্রকৃতি চির বহমান।
উদ্দীপক-২ প্রকৃতি ও জীবনের চিরন্তন প্রবাহকে ফুটিয়ে তুলেছে। পথে বাশি বাঁজবে, নদীর কূলে গরু চরবে, আঙিনায় শিশু খেলবে, পাখিরা গান গাইবে- এসব কখনো বন্ধ হবে না, শুধু দিন যেতে। থাকবে। 'সেইদিন এই মাঠ' কবিতায়ও একই ধরনের চিরায়ত চিত্র ফুটে উঠেছে। উভয় ক্ষেত্রেই মৃত্যু বা ধ্বংসকে ছাপিয়ে প্রকৃতি ও স্বপ্ন আপন নিয়মে প্রবাহিত হয়।
'সেইদিন এই মাঠ' কবিতার মূল ভাবনা হলো মানুষের মরণশীলতা ও প্রকৃতির চিরকালীন ব্যস্ততা। কবি জানেন প্রকৃতির রহস্যময় সৌন্দর্যের কোনো শেষ নেই। প্রকৃতি তার অফুরন্ত ঐশ্বর্য নিয়ে মানুষের স্বপ্ন-সাধ ও কল্পনাকে তৃপ্ত করে যাবে। উদ্দীপক-২ ঠিক সেই প্রাকৃতিক চিরন্তনের কথাই বলেছে। উদ্দীপকের বেণু, ধেনু, শিশু, পাখি- সবই প্রকৃতি ও জীবনের চিরায়ত প্রতীক। উদ্দীপক ও কবিতায় প্রকৃতির চিরন্তন প্রবাহের কথাই বলা হয়েছে। তাই উদ্দীপক-২ কবিতার চেতনার একটি বিশুদ্ধ ও প্রাণবন্ত প্রতিচ্ছবি। সুতরাং প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
