উদ্দীপক-১: মুহিত বরিশালে বেড়াতে যায়। একদিন খুব ভোরে লঞ্চঘাটে বেড়াতে গেলে অনেকেই তাকে দুষ্কৃতকারী মনে করে। লোকজন তার পরিচয় জানতে চাইলে সে ভয়ে তার নাম-ঠিকানা বলতে পারে না। লোকজনের সন্দেহ বেড়ে যায় এবং তাকে বেঁধে ফেলে। এমন সময় একজন পরিচিত লোক এসে তাকে সেই অবস্থা থেকে উদ্ধার করে।
উদ্দীপক-২:
বন পেরিয়ে মাঠ পেরিয়ে
এলাম সোনার গাঁয়
আমার আপন ঠিকানায়।
মায়ের আদর বোনের স্নেহ
সবুজ-শ্যামল গাঁয়
তাকি আমার হৃদয় জুড়ে যায়।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় অকাল বার্ধক্যে নত কদম আলী।
"খোদার কসম আমি ভিনদেশি পথিক নই"- কবি জন্মসূত্রে এ দেশের মানুষ এবং তিনি বিদেশি কেউ নন বলে এ কসম করেছেন।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় জন্মভূমির সঙ্গে কবির সম্পর্ক আজীবনের। জন্মভূমির সঙ্গেই কবির অস্তিত্বের শেকড় গাঁথা। তিনি কোনো আগন্তুক নন। এ দেশের প্রকৃতি, জনপদ সব যেমন কবির চেনা, তেমনই কবিকেও সবাই চেনে। আসমানের তারা, জমিনের ফুল, জোনাকি, গাছ সব সাক্ষী- কবি কোনো অভ্যাগত নন। তবুও সবার কাছে এটি আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে কবি খোদার কসম করে বলেছেন তিনি এদেশের মানুষ, কোনো ভিনদেশি পথিক নন। কবি মূলত এ কসমের মাধ্যমে দেশের প্রতি তার প্রগাঢ় অনুভূতিকে প্রকাশ করেছেন।
উদ্দীপক-১-এর সঙ্গে 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার কবির বৈসাদৃশ্য হলো- মুহিত অচেনা স্থানে আগন্তুক হয়ে সন্দেহের শিকার হয়; অন্যদিকে কবি নিজ জন্মভূমির সর্বত্র চেনা স্বজন ও আত্মীয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় কবি নিজ জন্মভূমির প্রতি গভীর অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন তিনি কোনো ভিনদেশি পথিক নন। গ্রামের মাঠ-ঘাট, আকাশ, ফুল-পাখি, জোনাকি, পুকুর, মাছরাঙা সবই তাঁর বহুদিনের চেনা। তাঁর শরীরে মাটির গন্ধ লেগে আছে। তিনি এ জনপদেরই সন্তান।
উদ্দীপক-১-এ মুহিত বরিশালে বেড়াতে গিয়ে দুষ্কৃতকারী সন্দেহে বন্দি হয়। লোকেরা তার পরিচয় জানে না, তাকে চেনে না বরং তার প্রতি সন্দেহ বেড়ে যায়। অথচ কবিতায় কবি একেবারে বিপরীত চিত্র এঁকেছেন- সব প্রকৃতি ও মানুষ তাঁকে চেনে, তিনি কারও অচেনা নন। মুহিত আগন্তুক হিসেবে সন্দেহ ও বন্দিত্বের শিকার; আর কবি 'অভ্যাগত' না হয়ে স্বজন হিসেবে সর্বত্র গৃহীত। মুহিতের পরিচয় না জানায় তাকে বেঁধে ফেলা হয় কিন্তু কবির পরিচয়ের জন্য কোনো প্রশ্নের প্রয়োজন নেই। তাঁর অস্তিত্বই তাঁর পরিচয়। তাই উদ্দীপক-১ কবির চিরচেনা স্বজনের অবস্থানের বিপরীত এক আগন্তুকের করুণ চিত্র।
উদ্দীপক-২ 'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূলভাবের একটি অংশমাত্র ধারণ করেছে, কিন্তু সমগ্র ভাব নয়।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতায় কবি জন্মভূমির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জন্মভূমির প্রতি তাঁর অবিচ্ছেদ্য দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি নিজেকে তাঁর দেশের বাস্তব পরিবেশের একজন পরিচিত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেছেন। কারণ তাঁর চিরচেনা জনপদ, মানুষ, নানা অনুষঙ্গ তাঁর কাছে অতি পরিচিত এবং তিনিও সেসবের চেনাজানা একজন।
উদ্দীপক-২ গ্রামীণ পরিবেশে নিজের ঠিকানায় ফিরে আসার আবেগঘন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তনের ভাব প্রকাশ পেয়েছে। এই ভাব কবিতার কবির 'অভ্যাগত' না হয়ে 'স্বজন হওয়া' ভাবের কাছাকাছি হলেও অনেক সংকীর্ণ। কবিতায় 'এখানে থাকা' বলতে সর্বত্রই থাকা অর্থাৎ সারা দেশের কথা বলা হয়েছে। উদ্দীপকে 'সোনার গাঁ' বলতে নিজের গ্রাম ও পরিবারের কথা রয়েছে।
'আমি কোনো আগন্তুক নই' কবিতার মূলভাব হলো- জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের বাস্তব ও অস্তিত্বগত সম্পর্ক, যেখানে মানুষ নিজেকে কখনো ভিনদেশি মনে করে না। এই জন্মভূমি তার অধিকারের জায়গা এবং অতি আপন। উদ্দীপক-২ কেবল 'ফিরে আসা', 'আদর-স্নেহ পাওয়া'- এই আবেগী ও সরল স্তরটুকু তুলে ধরেছে। কিন্তু কবিতার জন্মভূমির সাথে কবির গভীর চেতনার- যেখানের মাটি, বাতাস সবই কবির চেনা; এ বিষয়গুলো উদ্দীপকে নেই। কবিতায় আগন্তুক না হওয়ার পুনরুক্তি ও দৃঢ়তা রয়েছে, যা উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই এটি কবিতার সুরের অনুরণন মাত্র, মূলভাব নয়।
